সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে দুই শ্রমিক হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ চারজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এই সুপারিশ নিয়ে নানা মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ৬ মে কদমতলী বাস টার্মিনালে খুনের ঘটনায় নিহত বাস হেলপার রিপন আহমদের বাবা ছাবলু মিয়া ও নিহত দেলওয়ার হোসেনের বাবা আজির উদ্দিন পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এর মধ্যে রিপন হত্যা মামলায় সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়। হত্যাকা-ের পর পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করলেও মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত শ্রমিক নেতা ময়নুল ইসলাম ও আলী আকবর রাজনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ নিয়ে নিহতদের স্বজন এবং সাধারণ শ্রমিকদের একটি বড় অংশের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আসামি হয়েও পুলিশ প্রশাসনের সরকারি সভায় তাদের উপস্থিতি ও দাওয়াত পাওয়া নিয়ে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ৫ জুলাই সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) তৎকালীন কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যানজট নিরসনবিষয়ক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন হত্যা মামলার প্রধান আসামি ময়নুল ইসলাম ও আলী আকবর রাজন। জামিন না নিয়েই হত্যা মামলার চিহ্নিত আসামিদের এমন সরকারি সভায় অংশগ্রহণ নিয়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ১০ জুন দক্ষিণ সুরমা থানার এসআই মো. মফিজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারায় আদালতে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে মামলার প্রধান আসামি শ্রমিক সংগঠনের জেলা সভাপতি ময়নুল ইসলাম, দ্বিতীয় আসামি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, ষষ্ঠ আসামি আব্দুস শহিদ এবং সপ্তম আসামি সামসুল হক মানিককে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। এই প্রতিবেদনটি অগ্রবর্তী করেন দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি মো. আশরাফ উজ্জামান।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট চারজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। কমিশনারের নির্দেশে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি বাদীকেও অবহিত করা হয়েছে।
তবে আসামিরা ঘটনাস্থলে না থাকলেও হত্যাকা-ের নেপথ্য নির্দেশদাতা ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এটা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধেও চার্জশিট দেওয়া হবে।
দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি মো. আশরাফ উজ্জামান বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারায় প্রাথমিকভাবে অব্যাহতির সুপারিশ করার আইনি সুযোগ রয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। মামলায় এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ডিসি কোর্টের নেতৃত্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটিও সুপারিশটি অনুমোদন করেছে।
এদিকে রিপন হত্যা মামলার বাদী ও নিহত রিপনের পিতা ছাবুল মিয়া বলেন, আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি তদন্তকারী অফিসার আমাকে জানাননি। আমার সামনে তিনি একথা বলতে পারবেন না। বরং আমি লোকমুখে জানতে পেরেছি আমার ছেলে হত্যার আসামিদের ছেড়ে দেওয়ার কথা।
অন্যদিকে, বাসচালক দেলওয়ার হোসেন হত্যা মামলার বাদী আজির উদ্দিন জানান, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ভুল ব্যক্তিদের আসামি করেছিলেন। এরপর নিহত দেলওয়ারের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার প্রকৃত আসামিদের নাম উল্লেখ করে আদালতে একটি নতুন মামলা দায়ের করেন।
উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল সিলেট-জগন্নাথপুর রুটের বাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। মূলত মালিক সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধ হলেও তাতে শ্রমিক নেতারা একটি নির্দিষ্ট পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। বেধড়ক মারধরে গুরুতর আহত হন অন্তত সাতজন শ্রমিক। আহতদের মধ্যে বাস হেলপার রিপন আহমদ ও চালক দেলওয়ার হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন