ইউক্রেনের রাজধানী কিইভের কাছে আয়োজিত একটি ড্রোন প্রযুক্তি প্রদর্শনী লক্ষ্য করে রাশিয়া এক ভয়াবহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দিনের আলোয় প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই প্রদর্শনী হঠাৎ করেই রক্তপাতময় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র, যার ফলে ঘটনাস্থলেই অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং গুরুতর আহত হন প্রায় ১০০ জন। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আক্রমণটি চালাতে মস্কো তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যার মধ্যে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মাত্র একটি ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এই হামলার পর সামরিক প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিশেষ করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সের্হি বেসক্রেস্তভ, যিনি ‘ফ্ল্যাশ’ নামে বহুল পরিচিত এবং সেনা প্রযুক্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা লিউবা শিপোভিচের সুরক্ষা নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দেয়। যদিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নিজেরা অক্ষত থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন। বেসক্রেস্তভ জানান, নিরাপত্তার ঝুঁকি অনুধাবন করে তিনি স্বয়ং অনুষ্ঠানটি থেকে দূরে ছিলেন।
যুদ্ধের চরম মুহূর্তে এমন একটি উন্মুক্ত ও বহুল প্রচারিত প্রদর্শনীর আয়োজন নিয়ে ইউক্রেনের সর্বস্তরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রোসিকিউটর জেনারেল এ ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছেন। কার অনুমতিতে এবং কাদের নিরাপত্তাহীনতায় এমন আয়োজন সম্ভব হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে হামলা চালানো ড্রোন প্রস্তুতকারক ও গোয়েন্দাদের লক্ষ্য করেই এই নিখুঁত দূরপাল্লার আঘাত হানা হয়েছিল। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর ড্রোন প্রদর্শনীতে এটি মস্কোর তৃতীয় আক্রমণ।
সীমান্তজুড়ে প্রাণহানি ও প্রতিপক্ষের গভীরে ইউক্রেনের পাল্টা আঘাত : কিইভে হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনের অন্যান্য প্রান্তেও বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়েছে রুশ বোমাবর্ষণ। পূর্ব ইউক্রেনের স্লোভিয়ানস্ক শহরে রাশিয়ার ফেলা মারাত্মক গ্লাইড বোমায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া উত্তরাঞ্চলীয় সুমি শহরে শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই নতুন করে আরও দুজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে সামরিক কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে ইউক্রেনজুড়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১৫ ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক জরুরি বার্তায় সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া আরও একটি বিশাল আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে বলে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে।
তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীও হাত গুটিয়ে বসে নেই। কিইভে হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রুশ সীমান্তের ১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে কিরভ শহরের একটি সামরিক কারখানায় সফল ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। সেখানে কারখানার ছয় কর্মী নিহত এবং ২৬ জন আহত হন। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই অভিযানকে অত্যন্ত সফল আখ্যা দিয়ে বলেন, রুশ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী এই কারখানাকে নিষ্ক্রিয় করা জরুরি ছিল। এ ছাড়া রাশিয়ার সর্ববৃহৎ অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যম ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর সেন্ট পিটার্সবার্গ এলাকার বিভিন্ন গুদামে ইউক্রেনীয় ড্রোন সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডের দাবি, রুশ সশস্ত্র বাহিনীর সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি অচল করতেই এই গুদামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও সমুদ্রবন্দর পঙ্গু করার কৌশল : রণক্ষেত্রের লড়াই এবার তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছে কৃষ্ণসাগর এবং ইউক্রেনের দক্ষিণ কৌশলগত সমুদ্রবন্দরগুলোতে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের সময় কৃষ্ণসাগরে দুটি বাণিজ্যিক জলযানে তারা হামলা চালিয়েছে। ঐতিহাসিক স্নেক আইল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব সামুদ্রিক এলাকা এবং সাতোকা অঞ্চলের কাছাকাছি ইউক্রেনগামী একটি বাল্ক ক্যারিয়ার ও একটি ড্রাই কার্গো জাহাজকে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র দিয়ে নিশানা করা হয়। জাহাজ দুটি সামরিক রসদ নিয়ে ইউক্রেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চের্নোমর্স্ক বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। এছাড়া নিকোলায়েভ বন্দরের কাছে অবস্থানরত দুটি সামরিক টাগবোটেও সফল আঘাত হেনেছে রুশ নৌ ও বিমান বাহিনী।
পাশাপাশি ২৪ ও ২৫ জুলাইয়ের মধ্যবর্তী রাতে মিকোলাইভ, ওডেসা এবং ইজমাইল সমুদ্রবন্দরগুলোতে সমন্বিত বিমান হামলা চালিয়েছে মস্কো। রুশ তাস সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়, আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্দরের অবকাঠামো ও ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাজে নিয়োজিত জলযানগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করা। আক্রমণকারী ড্রোন স্কোয়াড্রন এবং আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য উচ্চ-নির্ভুল মারমুখী অস্ত্র দিয়ে এই তা-ব চালানো হয়। মিকোলাইভ বন্দরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য আনা রসদ খালাসের সময় একটি শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়। ওডেসা সমুদ্রবন্দরে গোলাবর্ষণের ফলে সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো গুঁড়িয়ে গেছে। দানিয়ুব নদীর তীরে অবস্থিত ইজমাইল সমুদ্রবন্দরে জ¦ালানি ও পিচ্ছিলকারক পদার্থ সংরক্ষণের বিশেষায়িত পরিকাঠামো এবং অস্ত্রাগার ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শত্রুর সামরিক রসদ সরবরাহের ক্ষমতা শূন্যে নামিয়ে আনতে এ ধরনের যৌথ হামলা অব্যাহত থাকবে।
সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধের প্রভাব : রাশিয়া ও ইউক্রেনের এই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ এখন দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আছড়ে পড়ছে। ইউরোপীয় দেশ রোমানিয়া জানিয়েছে, শুক্রবার তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করা একটি রুশ ড্রোনকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে সেটি ভূপাতিত করেছে দেশটির বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোশর দান ঘটনাটিকে মারাত্মক উসকানিমূলক বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, রণক্ষেত্রের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও নতুন করে শান্তি আলোচনার আশা নিয়ে আগামী সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।
মধ্যপ্রাচ্য ও সিআইএ স্থাপনায় হামলার পেছনে রাশিয়ার ভূমিকার সন্দেহ : যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে বিশ্ব রাজনীতির আরেক চাঞ্চল্যকর অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক নতুন অনুসন্ধানে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সিআইএর একাধিক গোপন ও প্রকাশ্য স্থাপনায় সাম্প্রতিক ইরানি ড্রোন হামলার নেপথ্যে রাশিয়ার সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে ওয়াশিংটন। গত মার্চ মাসে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিআইএ স্থাপনায় সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলা চালানো হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ভেতরের সিআইএ স্টেশন, অপরটি ছিল পূর্ব ইরাকের একটি অতি গোপনীয় সামরিক কেন্দ্র। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আরও একাধিক গোপন স্থান এই আক্রমণের নিশানা হয়েছিল। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, হামলাগুলো নিখুঁত ও লক্ষ্যভেদী করতে রাশিয়া ইরানকে মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে থাকতে পারে। জর্ডানে সম্প্রতি একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে রাশিয়ার অত্যাধুনিক ‘কোমেটা-এম’ নামক উপগ্রহভিত্তিক দিকনির্ণয় প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা যেকোনো ধরনের প্রযুক্তিগত বাধা বা সিগন্যাল জ্যামিং এড়িয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম।
উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা ভবিষ্যৎ : ইউক্রেনের মাটিতে একের পর এক ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে রাশিয়ার ভৌগোলিক সীমানার গভীরে ইউক্রেনের পাল্টা ড্রোন আঘাতÑ সব মিলিয়ে সংঘাত এক অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করেছে। এর ওপর কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যপথ অচল হয়ে পড়া এবং আন্তর্জাতিক আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা সমগ্র ইউরোপ ও বিশ্ব অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলছে। শান্তি আলোচনার টেবিলে কূটনীতিবিদদের বসার প্রচেষ্টা চললেও রণক্ষেত্রের বাস্তবতায় আপাতত শান্তির কোনো সুবাতাস দেখা যাচ্ছে না। হামলা ও পাল্টা হামলার এই বিধ্বংসী চক্র কত দূর গিয়ে থামে, সেদিকেই এখন উদ্বেগের সঙ্গে তাকিয়ে রয়েছে পুরো বিশ্ব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন