‘ক্যামনে চলি বাপ, আর পারি না। জিনিস-পত্তরের যে দাম। আগের মতো মানুষ আর ভিখও দেয় না।’ রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান দিচ্ছিলেন ষাটোর্ধ্ব একজন ভিক্ষুক। এটি এখন আর ব্যক্তিগত বেদনা নয়, আজকের বাংলাদেশে এটি পরিণত হয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি হিসেবে। যখন একজন ভিক্ষুকও বলেন, ভিক্ষা করে আর পেট চলে না, তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল নি¤œআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, নি¤œবিত্তের থালায় খাবার কমছে, আর দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকাই হয়ে উঠছে প্রতিদিনের সংগ্রাম।
রাজধানীর বাজারগুলো ঘুরে দেখা যাচ্ছে, মাছ, ডিম, সবজি, কাঁচামরিচ, মুরগি, চাল ও পেঁয়াজ, প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম একযোগে বেড়েছে। কিছু পণ্যের দাম কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে কাঁচামরিচের মতো পণ্যের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন কমে যাওয়া, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটের কথা বলছেন। এসব কারণ বাস্তব হলেও প্রশ্ন হলো, একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কি পুরো বাজারকে এত সহজে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে?
বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষা, বন্যা কিংবা অতিবৃষ্টি হয়। তা হলে প্রতিবারই যদি একই অজুহাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে বোঝা যায় সমস্যার মূল কেবল প্রকৃতিতে নয়। প্রস্তুতির অভাব, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা, বাজার তদারকির ঘাটতি এবং অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা এবং কার্যকর নজরদারির অভাব বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, খামার পর্যায়ে ডিম বা কৃষকের খেতের সবজির দাম যে হারে বাড়েনি, খুচরা বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করছেন, কোথাও কোথাও অযৌক্তিকভাবে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। এটি স্পষ্টতই বাজারে জবাবদিহির সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
সরকারের দায়িত্ব কেবল বাজার পর্যবেক্ষণ নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি গ্রহণও। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা, কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বাজারে সিন্ডিকেট ও কারসাজির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে কেউ দুর্যোগকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক মুনাফা করতে না পারে।
পাশাপাশি নি¤œআয় ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে হবে। টিসিবিসহ সরকারি বিপণন ব্যবস্থার আওতা বাড়িয়ে বেশি সংখ্যক মানুষকে এর সুবিধার মধ্যে আনতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাও বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী সম্প্রসারণ জরুরি।
মূল্যস্ফীতি কেবল অর্থনৈতিক সূচকের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবনমান, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাজারে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু মানুষের রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর অভিঘাত পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও।
আমরা মনে করি, এখন প্রয়োজন কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ নয়, দ্রুত, সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। মানুষের প্রত্যাশা, সরকার বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যেখানে একজন শ্রমিক, একজন নি¤œবিত্ত পরিবার কিংবা সেই বৃদ্ধ ভিক্ষুক, কেউই নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে গিয়ে যেন অসহায় হয়ে না পড়েন। বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বও বটে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন