× UCB Sticker Card
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

নুরুল মুহাম্মদ কাদের, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

গুরুশিষ্য সম্পর্কের অবক্ষয় ও শিক্ষাবাণিজ্য

নুরুল মুহাম্মদ কাদের, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৩:১৪ এএম

গুরুশিষ্য সম্পর্কের অবক্ষয় ও শিক্ষাবাণিজ্য

১৯৯৫ সালে বাঁশখালী উপজেলার গ-ামারা বড়ঘোনা উচ্চবিদ্যালয় থেকে যখন এসএসসি পাস করি, তখন চারপাশের চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত কাঁচা দেয়াল আর তিন ভাগে দুই সারির বেঞ্চে বসেই আমরা পাঠ নিয়েছি। খালি পেটে কিংবা পান্তা ভাত খেয়ে স্কুলে গেছি, কিন্তু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হইনি। তৎকালীন শিক্ষকরা শুধু পাঠদানই করাতেন না, অভিভাবকহীন এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে তারা ছিলেন দ্বিতীয় পিতা, সঠিক পথের পথপ্রদর্শক এবং অনন্য এক নিঃস্বার্থ সত্তা। সেই সময়ে ‘শ্রেণি বৈষম্য’ শব্দটি শিক্ষকদের অভিধানে ছিল না। ক্লাসের বাইরেও তারা নাছোড় বান্দার মতো পড়া বুঝিয়ে দিতেন; গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে প্রাইভেট পড়াতেন। তাদের কাছে শিক্ষকতা ছিল এক পবিত্র সেবামূলক কাজ, যেখানে কোনো আর্থিক হিসাব-নিকাশ ছিল না। শিক্ষার্থীদের সাফল্যই ছিল তাদের পরম প্রাপ্তি। বিদায় অনুষ্ঠানে সন্তানদের মতো শিক্ষার্থীদের বিদায় দিতে গিয়ে শিক্ষকদের চোখে জল ঝরত। তাদের সেই শিক্ষা, স্নেহ ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে আছে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষকদের হেনস্তা করার যে একের পর এক ঘটনা ঘটছে, তা আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবক্ষয়ের সংকেত দেয়। আজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ শিক্ষার কদর্য বাণিজ্যিকীকরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত করা।

টাকা দিয়ে শিক্ষা কেনা : আশির দশকে ভর্তি পরীক্ষা-কেন্দ্রিক যে বাণিজ্যিক কোচিংয়ের সূচনা হয়েছিল, নব্বইয়ের দশকে তা ব্যাচ ও একাডেমিক কোচিংয়ে রূপ নেয়। পরবর্তী সময়ে সৃজনশীল পদ্ধতি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের যুগে তা আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চিরন্তন আত্মিক সম্পর্কটি আজ ‘পণ্য ও ক্রেতা-বিক্রেতা’র সম্পর্কে গিয়ে ঠেকেছে। টাকা দিয়ে শিক্ষা কেনার এই সংস্কৃতির কারণে শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে ‘গুরু’ না ভেবে ‘টাকা দিয়ে কেনা সেবাদাতা’ মনে করছে। অনেক শিক্ষকও স্কুলে ঠিকমতো পাঠদান না করে সেই শ্রম ও মেধা জমিয়ে রাখেন নিজের প্রাইভেট ব্যাচে। যারা শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ে না, তাদের ক্লাসে অবহেলা করা, পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া এবং প্রাইভেট পড়া শিক্ষার্থীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার মতো অভিযোগ এখন অহরহ। কিছু শিক্ষকের রাজনৈতিক দলাদলি, বাণিজ্যিক মানসিকতা ও অনৈতিক আচরণ শিক্ষার্থীদের মনে শ্রদ্ধার বদলে ক্ষোভ ও অশ্রদ্ধা তৈরি করছে।

কোচিং সংস্কৃতির ভয়াবহ প্রভাব

শ্রেণিকক্ষে নিষ্ক্রিয় হওয়া : শিক্ষার্থীরা ধরে নেয় মূল পড়াশোনা কোচিংয়েই হবে, ফলে স্কুলের ক্লাসের প্রতি তাদের আগ্রহ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

বৈষম্য ও ব্যয় বৃদ্ধি : কোচিংয়ের চড়া ফি দিতে না পেরে প্রান্তিক পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা জিম্মি হয়ে পড়ছেন।

স্বাধীন চিন্তার অপমৃত্যু : সাজেশন, শর্টকাট টেকনিক ও গাইড-নির্ভরতায় শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা ধ্বংস হচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোচিংয়ের জাঁতাকলে পড়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ রুদ্ধ হচ্ছে।

উত্তরণের উপায় ও করণীয় : শিক্ষাব্যবস্থার এই ভেঙে পড়া মেরুদ- সোজা করতে হলে অনতিবিলম্বে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবেÑ

*কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়াতে পারবেন না এই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

*সরকারি তদারকি ও তদারকি কমিটির মাধ্যমে ক্লাসে সঠিক পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী সম্মানজনক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

* নীতিমালার বাইরে চলা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশ্নফাঁস বা সাজেশন বাণিজ্যে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।

* জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তক এমনভাবে সহজবোধ্য করা দরকার যেন তা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পড়ে বুঝতে পারে।

শিক্ষকরা যদি সেই পূর্বের ন্যায় স্নেহের পরশ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসেন এবং শিক্ষার্থীরাও যদি বাণিজ্যিক প্রভাবমুক্ত হয়ে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতে শেখে, তবেই আমাদের শিক্ষাঙ্গন এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পাবে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!