অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সম্ভাব্য কোনো সমাধান না থাকায় বাংলাদেশ বর্তমানে কঠিনতম সংকটের মুখোমুখি। একই সঙ্গে চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক চর্চার পথ খুলে দিয়েছে। দেশ এ মুহূর্তে একটি গণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার দিকে হাঁটছে।’
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান। দুই দিনব্যাপী বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্সের আয়োজন করেছে ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (দায়রা)।
উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে কঠিনতম সংকট হলো, রোহিঙ্গা সমস্যার সম্ভাব্য কোনো সমাধান আমাদের হাতে নেই। যত দিন যাচ্ছে, সংকট তত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আশ্রয় শিবিরে শিশু ও তরুণদের সংখ্যা বেড়েছে। তারা বড় হতে শুরু করেছে এবং আর ক্যাম্পের জীবন মেনে নিতে চাইবে না। এটা আমাদের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়েও গুরুতর প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে।’
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আগমনের শুরুর সময় থেকেই আমি বলেছিলাম, যত দিন যাবে, এটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নেবে। কারণ মিয়ানমারের বাহিনীর লক্ষ্যই হলো দেশটিকে রোহিঙ্গাশূন্য করা। তাই প্রত্যর্পণের সুযোগ কোথায়?’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘তরুণরা পথ চলতে ভুল করতেই পারে, কিন্তু সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারা একটি শক্তিশালী ও ন্যায্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে অতীতের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরতে দেবে না।’
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘তাদের দৃঢ় সংকল্প আর সাহস না থাকলে আমরা যে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি, তা সম্ভব হতো না’। নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে অতীতের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরতে দেবে না বলে আশা প্রকাশ করেন উপদেষ্টা।
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে তিনটি ঘটনা ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় গণহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা। পশ্চিমা জনমত, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এমনকি ইহুদি বুদ্ধিজীবী মহলের ভেতর থেকেও গাজায় ইসরায়েলের কর্মকা-ের নিন্দা বাড়ছে।’
দেশীয় অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘দেশে চলছে এক ধরনের শিক্ষাগত বর্ণবৈষম্য। অল্প কিছু মানুষ বিশ্বমানের শিক্ষা পাচ্ছে, আর বিপুলসংখ্যক শিশু বিশেষত গ্রামীণ এলাকার, মৌলিক মানসম্পন্ন শিক্ষাও পাচ্ছে না’।
তিনি জানান, প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলাও পড়তে পারে না, ইংরেজি তো দূরের কথা। এ ধরনের বৈষম্য জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘ঢাবিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমাতে হবে। তবে বিজ্ঞানে, অর্থনীতিতে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার সাবেক শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক মাজলি বিন মালিক বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ফিরে এসেছে। সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপ করছে, এটি খুবই ভালো পদক্ষেপ।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এসব সংস্কারের সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশের জন্য নয় বরং সারা বিশ্বের যেকোনো দেশের অগ্রগতির জন্যই একটি লিটমাস টেস্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারদারাজান বলেন, ‘বাংলাদেশ তার ভবিষ্যতের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।’ বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস তৈরির পথে হাঁটছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশ যা করতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের দিকে ইঙ্গিত করে’। সম্প্রতি বাণিজ্য উপদেষ্টার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে কমিয়ে আনা হয়।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের পরতে পরতে আমরা বারবার স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি। এ কারণে বারবার আমাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। আমরা আবারও রুখে দাঁড়িয়েছি, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং নতুন করে স্বপ্ন দেখেছি’।
মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের অভ্যুত্থান নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার নতুন স্বপ্ন দেখার পরই আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরে, আর আমরা ব্যর্থ হই। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে’। নেপালের সাবেক মন্ত্রী ড. দীপক গাওয়ালি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণরা যারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে, তাদের বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে’।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা বলেন, ‘অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তনের জন্য ঘটেনি; বরং পুরো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পালটে ফেলার জন্যই ঘটেছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচনি প্রচার থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি জায়গায় যেভাবে টাকার ব্যবহার হয়, এতে চাঁদাবাজির হার বেড়ে যায়। এ ছাড়া ক্ষমতা দেখানোর সংস্কৃতি বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ যে টাকা ও পেশিশক্তির রাজনীতি আর দেখতে চায় না, তা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই প্রমাণ হয়েছে।’
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন