রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৫

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০১:৩৪ এএম

কপাল খুলছে বাংলাদেশের, ট্রাম্পের শুল্কারোপ

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০১:৩৪ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি- সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি- সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যে বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছেন, তার বেশির ভাগকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশটির একটি আপিল আদালত। এই আদেশ ট্রাম্পের পররাষ্ট্র নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং আইনি দ্বন্দ্বের শঙ্কা তৈরি করেছে। রায়ে চীন, মেক্সিকো, কানাডাসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে আরোপিত বাড়তি শুল্কের বড় অংশকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ইউএস কোর্ট অব আপিলস ফর দ্য ফেডারেল সার্কিটের বিচারকদের ৭-৪ ভোটে এ রায় দেওয়া হয়। তবে আদালতের অবৈধ ঘোষণা এবং ট্রাম্পের নজিরবিহীন বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে অপ্রত্যাশিতভাবে এক বড় সুযোগে পরিণত হয়েছে। পোশাকের অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা বায়ার, আগে যারা চীন ও ভারত থেকে পোশাক কিনতে তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্ডার নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছে। স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকরা এই সুযোগটি কাজে লাগাতে আগে স্থগিত রাখা কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পুনর্জীবিত করছেন, বন্ধ থাকা কারখানা খুলছেন, নতুন বিনিয়োগের কথাও ভাবছেন। কেবল দেশীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, এর প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও।

বৈশ্বিক সোর্সিং প্রবণতা বদলাতে দেখে চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে নতুন উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন। ট্রাম্পের শুল্ক, যা একসময় হুমকি মনে হয়েছিল সেটিই এখন দেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সুযোগে পরিণত হয়েছে।

এদিকে গত শুক্রবার ট্রাম্পের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে ‘আইনের পরিপন্থি ও অবৈধ’ বলেছে আদালত। অবশ্য ট্রাম্প প্রশাসন যাতে এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারে, সেজন্য ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত রায়টি কার্যকর হবে না বলে জানানো হয়েছে। এ রায়ের সমালোচনা করে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, এই রায় যদি বহাল থাকে, তাহলে এটি যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেবে।

তিনি লিখেছেন, চরম পক্ষপাতদুষ্ট একটি আপিল আদালত আজ ভুলভাবে বলেছে যে, ‘আমাদের শুল্ক সরিয়ে ফেলা উচিত’, কিন্তু তারা জানে আমেরিকাই শেষ পর্যন্ত জিতবে। এই শুল্ক যদি কখনো বাতিল হয়ে যায়, তবে তা দেশের জন্য পুরোপুরি বিপর্যয়কর হবে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের আর্থিকভাবে দুর্বল করে ফেলবে; কিন্তু আমাদের শক্তিশালী হওয়া দরকার। জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকির’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

ট্রাম্পের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অসমতা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, এ কারণে তিনি বাণিজ্যের ওপর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আদালত বলেছে, শুল্ক আরোপ করা প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারে পড়ে না; বরং শুল্ক ঠিক করা কংগ্রেসের ‘প্রধান দায়িত্বের একটি’।

১২৭ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়েছে, জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনে কোথাও ‘শুল্ক’ শব্দের উল্লেখ নেই এবং এতে এমন কোনো কাঠামো নেই- যা প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অবারিত ক্ষমতা দেয়। আদালত বলছে, কর ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের অধিকারেই রয়ে গেছে এবং এই ক্ষমতার ওপর জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে না। রায়ে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস যখন এই আইন পাস করে, তখন তারা প্রেসিডেন্টকে সীমাহীন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেনি। ছোট ব্যবসায়ী ও দেশটির একটি রাজ্য জোটের দুই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত এপ্রিলে এক নির্বাহী আদেশে প্রায় সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ ভিত্তি শুল্ক এবং বহু দেশের ওপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে দেন। ট্রাম্প সেই দিনটিকে ‘অন্যায্য বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে মুক্তির দিন’ বলেও বর্ণনা করেছিলেন। এরপরই মামলা দুটি দায়ের করা হয়।

এর আগে গত মে মাসে নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে আপিল প্রক্রিয়া চলায় সেটি এখনো কার্যকর হয়নি। শুক্রবারের রায়ে চীন, মেক্সিকো ও কানাডার ওপর আরোপিত শুল্ককেও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এই শুল্কগুলোর পেছনে ট্রাম্প বলেছিলেন, মাদকদ্রব্য আমদানি ঠেকাতে এ পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে প্রেসিডেন্টের অন্য এখতিয়ারের আওতায় স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর বসানো শুল্কের ক্ষেত্রে এ রায় প্রযোজ্য হবে না। রায়ের আগে হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা বলেন, শুল্ক বাতিল হলে ১৯২৯ সালের মতো আর্থিক মন্দা, শেয়ারবাজার ধস এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

তারা একটি চিঠিতে লেখেন: ‘জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা হঠাৎ করে বাতিল করা হলেÑ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র নীতি ও অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) আরোপ করেন যা তখনো পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের প্রস্তাবিত হারের চেয়ে অনেক বেশি ছিল তখন রপ্তানিকারকরা প্রধান রপ্তানির এখাতে বড় আঘাতের আশঙ্কা করেছিলেন। তবে নাটকীয়ভাবে, ১ আগস্ট শুল্কারোপের সময়সীমার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করে এবং ভারতের ক্ষেত্রে তা ২৫ শতাংশ করে বাড়ায়। এ ছাড়া রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ২৭ আগস্ট থেকে ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেয়। এই পরিবর্তন পুরো চিত্রটাই বদলে দিয়েছে।

ভারত, চীন ও মিয়ানমার থেকে আগে যেসব ক্রেতা অর্ডার করত, তারা এখন বাংলাদেশে কার্যাদেশ দিতে প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ করছে। স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকরা এই সুযোগটি কাজে লাগাতেÑ আগে স্থগিত রাখা কারখানা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পুনর্জীবিত করছেন, বন্ধ থাকা কারখানা খুলছেন, নতুন বিনিয়োগের কথাও ভাবছেন। কেবল দেশীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, এর প্রভাব পড়ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও। বৈশ্বিক সোর্সিং প্রবণতা বদলাতে দেখে চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে নতুন উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন।

ট্রাম্পের শুল্ক, যা একসময় হুমকি মনে হয়েছিল সেটিই এখন দেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সুযোগে পরিণত হয়েছে। স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ বলেন, আমাদের কারখানায় অর্ডার বেড়েছে, বেশির ভাগই আমেরিকান বায়ারদের কাছ থেকে।

প্রায় ৩০ কোটি ডলারের বার্ষিক রপ্তানিকারক এই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জানান, গত বছর এক মার্কিন বায়ারকে ৩ লাখ ডাউন জ্যাকেট রপ্তানি করেছিলেন, এবার সেই ক্রেতা ৫ লাখ পিস নিতে চাইছেন। অন্য এক ক্রেতা ৬০ হাজার পিস থেকে বাড়িয়ে ১.৫ লাখ পিসের অর্ডারের জন্য আলোচনা শুরু করেছেন।

তিনি আরও জানান, চাহিদা মেটাতে কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। নতুন ক্যাপিটাল মেশিনারি (মূলধনী যন্ত্রপাতি) আমদানি করতে হবে। বর্তমানে আমাদের ৩০টি প্রোডাকশন লাইন আছে, যা সম্প্রসারিত হয়ে ৪৫টি হতে পারে। অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, আমাদের ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্ডার লাইনআপ হয়ে আছে। সম্প্রতি দুই মার্কিন ক্রেতার প্রতিনিধি প্রাথমিক আলোচনার জন্য এসেছিলেন, কিন্তু স্পেস এভিলেবল না থাকায় অর্ডার নিতে পারিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক পরিবর্তনে সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। তারা নতুন বিনিয়োগ, কারখানা ভাড়া নেওয়া এবং বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করতে আগ্রহী দেখাচ্ছেন। এক নিটওয়্যার কারখানার মালিক নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, ‘আমি ইতোমধ্যে একটি কারখানা চীনা উদ্যোক্তাদের কাছে ভাড়া দিয়েছি। গত সপ্তাহে তারা আরেকটি কারখানা রেন্ট নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।’

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, চীনা বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি চলমান নয়Ñ এমন রেডি-টু-ইউজ কিন্তু বর্তমানে বন্ধ আছে এমন কারখানা কিনতেও আগ্রহী। এ ছাড়া চীনা বায়িং হাউসগুলো বাংলাদেশের পোশাক কারখানার সঙ্গে ফ্রি অব চার্জ (এফওসি) ব্যাবসায়িক মডেল কাজ করার সুযোগ খুঁজছে। এ ধরনের ব্যবস্থায়Ñ বায়াররা কাঁচামাল সরবরাহ ও আর্থিক খরচ বহন করে, আর কারখানা কর্তৃপক্ষ শুধু উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়। এতে প্রস্তুতকারকের ঝুঁকি কম হলেও লাভের হারও কম, কারণ শুধু কাটিং ও মেকিং খরচ দেওয়া হয়।

ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, ‘অনেক কারখানা এফওসিভিত্তিক অর্ডার নিয়ে আলোচনা করছে, তবে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত কার্যাদেশ থাকায় আমরা এমন অফার গ্রহণ করছি না।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ১৯১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার বেশির ভাগই ছোট। একই সময়ে প্রায় ১০০টি নতুন কারখানা উৎপাদন শুরু করেছে। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে বড় কারখানায় ১৫ হাজার পর্যন্ত শ্রমিক ছিল।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!