যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা থেকে সাম্প্রতিক সময়ে রহস্যময় কিছু চার্টার উড়োজাহাজে শত শত ফিলিস্তিনিকে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব উড়োজাহাজ পরিচালনার পেছনে একটি ইসরায়েলি সংগঠন জড়িত। তারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অন্য দেশে পাঠিয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব উড়োজাহাজের আয়োজন করেছে ‘অ্যাড কান’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অতীতে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে পুনর্বাসনের প্রস্তাবকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে অন্তত তিনটি উড়োজাহাজে গাজার বাসিন্দাদের বিদেশে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ষাটজন ফিলিস্তিনিকে মে মাসে ইসরায়েল থেকে হাঙ্গেরি হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হয়। পরে অক্টোবর মাসে প্রায় একশ সত্তরজনকে কেনিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া নভেম্বরে আরেকটি উড়োজাহাজে প্রায় একশ পঞ্চাশ জন ফিলিস্তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান। তবে এই পুরো কার্যক্রমে ইসরায়েলি সংশ্লিষ্টতা আড়াল করতে সংগঠনটি সরাসরি নিজেদের নাম ব্যবহার করেনি। মানবিক সহায়তা সংস্থা হিসেবে পরিচিত ‘আল মাজদ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়। বার্তা সংস্থাটির হাতে থাকা চুক্তিপত্র, যাত্রী তালিকা, বার্তা আদান-প্রদান ও আর্থিক নথি এবং দুই ডজনের বেশি ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গাজা থেকে বেরিয়ে যাওয়া কয়েকজন ফিলিস্তিনির সঙ্গেও কথা বলেছেন অনুসন্ধানকারীরা। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানো সাতত্রিশ বছর বয়সি এক ফিলিস্তিনি বলেন, দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কারণে তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তিনি বলেন, দুই বছর ধরে চারদিকে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর সন্তানদের বাঁচাতে গাজা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। অন্য এক ফিলিস্তিনি জানান, তিনি উড়োজাহাজে ওঠার আগে গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল পরিবারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে নিরাপদে বের করে আনা। জানা গেছে, উড়োজাহাজে ওঠা অনেক যাত্রীকেই প্রায় দুই হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। অর্থ পাঠানো হয়েছে ব্যাংক লেনদেন বা ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোনাল্ড লামোলা এই উড়োজাহাজগুলোকে গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অংশ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ যদি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তাহলে তাকে প্রকৃত অর্থে স্বেচ্ছা অভিবাসন বলা যায় না। তাদের আশঙ্কা, এভাবে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে উৎসাহিত করা হলে ভবিষ্যতে নিজভূমিতে ফিরে আসা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

