দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, অবরোধ ও মানবিক সংকটে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা এখন বিশ্বের অন্যতম করুণ বাস্তবতার প্রতীক। ২০০৭ সাল থেকে ইসরায়েলের আরোপিত স্থল, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধে প্রায় ২৩ লাখ মানুষের এই ভূখ- কার্যত বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক ইতিহাসে এটি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ নৌ অবরোধগুলোর একটি।
যুদ্ধ শুরুর আগেও গাজার জেলেদের সমুদ্রে মাছ ধরার পরিসর কঠোরভাবে সীমিত ছিল। অসলো চুক্তি অনুযায়ী ২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত যাওয়ার অধিকার থাকলেও বাস্তবে তাদের ৬ থেকে ১৫ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে নতুন যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। খাদ্য সংকট ও অনাহারের মুখে অনেক জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে যেতে বাধ্য হন। এতে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবরোধ ভাঙার চেষ্টা, সমুদ্রে হামলা : গাজার অবরোধ ভাঙতে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে একাধিক মানবাধিকারভিত্তিক নৌবহর গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক জলসীমায় এসব জাহাজ আটক বা হামলার শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে গাজা থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা বহু জাহাজে অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থি।
ইতিহাসের অন্যান্য অবরোধের সঙ্গে তুলনা : বিশ^ ইতিহাসে নৌ অবরোধ নতুন নয়। নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বিয়াফ্রা অবরোধে লাখো মানুষ অনাহার ও রোগে মারা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও অবরোধকে শত্রু দুর্বল করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গাজার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ এখানে অবরোধ শুধু সামরিক কৌশল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ একটি পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে।
মানবিক সংকট আরও গভীর : অধিকারকর্মীরা বলছেন, গাজার মানুষ আজ বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। শিশুদের অপুষ্টি, চিকিৎসা সংকট, বেকারত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা প্রতিদিন আরও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সত্ত্বেও এখনো স্থায়ী সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে অবরুদ্ধ গাজার মানুষের দুর্ভোগ যেন শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না।

