পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সীমান্ত উত্তেজনা এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সীমান্তবর্তী সামরিক অভিযানের পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তানের ভেতরে সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আকাশপথে হামলা চালানোর দাবি করেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। অন্যদিকে ইসলামাবাদ বলছে, আফগানিস্তান থেকে পাঠানো চারটি মনুষ্যবিহীন আকাশযান সীমান্তেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের পরস্পরবিরোধী দাবি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সীমান্তে সামরিক তৎপরতা অঞ্চলজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে সক্রিয় তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখার একাধিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আকাশ হামলা চালানো হয়েছে। তালেবান সরকারের দাবি, এসব হামলা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নির্ভুল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় একাধিক জঙ্গি নিহত এবং বিভিন্ন ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, অভিযানে কোনো নিরীহ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সিদ্দিকুল্লাহ নুসরাত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, পাকিস্তানের ভেতরে যেসব স্থানে জঙ্গিরা আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন নাশকতার পরিকল্পনা করছিল, সেসব লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানা হয়েছে। তার দাবি, হামলার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আফগান সরকারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তান সম্প্রতি আফগান ভূখ-ে যে সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং তাতে বহু সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন, সেই ঘটনারই জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তাই আত্মরক্ষার অধিকার থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তালেবান সরকারের দাবি অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখোয়ার সারান এলাকার একটি বিদ্যালয়কে জঙ্গিদের গোপন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। ওই স্থাপনাকে লক্ষ্য করেই একটি গুরুত্বপূর্ণ হামলা চালানো হয়। আফগানিস্তানের ভাষ্য, সেখান থেকেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালিত হচ্ছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তান এসব দাবিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে চারটি মনুষ্যবিহীন আকাশযান পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করে। তবে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সেগুলো শনাক্ত করে এবং ভূপাতিত করে। তাদের দাবি, এ ঘটনায় সম্ভাব্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আফগান ভূখ-ে অবস্থান নেওয়া সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় এসব আকাশযান পাঠানো হয়েছিল। একই সঙ্গে আফগান তালেবান সরকারকে সতর্ক করে ইসলামাবাদ বলেছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের যেকোনো উসকানির কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পাকিস্তানের ভাষ্য, তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। তবে পাকিস্তানের এই দাবির বিপরীতে আফগানিস্তান বলছে, তাদের হামলা ছিল জঙ্গিদের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের রাষ্ট্র বা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। ফলে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূচনা হয় করাচিতে আধাসামরিক বাহিনীর একটি স্থাপনায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর। ওই ঘটনায় পাকিস্তানের তিন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন। হামলাকারীদের মধ্যে তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয় এবং একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই হামলার দায় স্বীকার করে একটি জঙ্গিগোষ্ঠী।
এর পরই পাকিস্তান আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থল ও আকাশপথে যৌথ সামরিক অভিযান চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে আফগানিস্তান বলছে, পাকিস্তানের হামলার প্রধান শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের হিসাবে, ওই হামলায় অন্তত ছত্রিশজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং এক শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। তালেবান সরকারের উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক আকাশ হামলার দাবি সেই ঘোষণারই বাস্তব রূপ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রাশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের উচিত সামরিক সংঘাত বন্ধ করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধের সমাধান করা। রাশিয়া সাম্প্রতিক বিমান হামলার ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
ভারতও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সীমান্ত অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে করাচির হামলার সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার পাকিস্তানি অভিযোগও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত।
এদিকে পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ডন’ সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে একটি ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে সীমান্ত অঞ্চলে জঙ্গিগোষ্ঠীর গোপন আস্তানাকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যঙ্গচিত্রে দেখানো হয়েছে, সীমান্তের উভয় পাশে সশস্ত্র জঙ্গিদের উপস্থিতি কীভাবে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা সংকটে জর্জরিত। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আফগান ভূখ- ব্যবহার করে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী পাকিস্তানে হামলা চালায়। অন্যদিকে আফগানিস্তান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তান সীমান্তে সামরিক অভিযান চালিয়ে বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ সীমান্ত অঞ্চলে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগের পরিবর্তে যদি সামরিক প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, তবে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নয়, সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক মহল এখন সংযম, সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সংকট নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন