ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

অগ্নিগর্ভ হরমুজ, অনিশ্চয়তায় বিশ্ব 

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওমান উপকূলের কাছে একটি জ্বালানিবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তুর আঘাতে আগুন লাগার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৈশি^ক জ্বালানি বাজারেও।

জাহাজে হামলার পর বাড়ল উদ্বেগ :

ওমানের লিমা উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে দক্ষিণমুখী একটি জ্বালানিবাহী জাহাজের বাঁ-পাশে ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ একটি বস্তু আঘাত হানার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। ঘটনার সময় জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ওমান উপসাগরের দিকে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচনা করছে। ইরানের গণমাধ্যম দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজটি একাধিক সতর্কবার্তা অমান্য করেছিল। তবে দেশটির কোনো সরকারি কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার দায় স্বীকারও করেননি, আবার অস্বীকারও করেননি। ফলে হামলার দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তপ্ত কূটনীতি :

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজের দিকে ইরানের সামরিক বাহিনী অন্তত দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এতে দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করায় জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, হরমুজ প্রণালিতে নির্ধারিত নিরাপদ পথ ব্যবহার করতে হবে এবং দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

আলোচনা চলছে, তবু থামছে না হুমকি :

উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর সেই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর ভাষায় বলেছেন, ইরানের সঙ্গে হয় একটি চূড়ান্ত সমঝোতা হবে, নয়তো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে হুমকি অব্যাহত থাকলে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে না। তিনি উভয়পক্ষকে পূর্বস্বাক্ষরিত সমঝোতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান।

শোকের মধ্যেও উত্তেজনা :

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে। রাজধানী থেকে কোমনগর পর্যন্ত শোকযাত্রা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই হরমুজে নতুন হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সময় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। 

তেলের বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা :

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এখান দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে। যদিও যুদ্ধের শুরুর সময়ের তুলনায় সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বাজারে আতঙ্ক কিছুটা কমেছে, তবু ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে তেলের দাম নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক চাহিদার ওপর।

বিকল্প পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো :

হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব পশ্চিম উপকূলমুখী বিদ্যমান তেল পরিবহন পাইপলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে হরমুজ এড়িয়ে আরও বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করা সম্ভব হবে। জানা গেছে, সৌদি আরব প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য যৌথ অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা করছে। কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনও বিকল্প পরিবহনপথ নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেবানন-ইসরায়েল সংলাপেও অগ্রগতির চেষ্টা :

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা আগামী সপ্তাহে ইতালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি কাঠামোগত সমঝোতার ধারাবাহিকতায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশা, এই সংলাপ সফল হলে সীমান্ত উত্তেজনা কিছুটা হলেও কমতে পারে।

কিউবায় জ্বালানি সংকটে অন্ধকার :

বিশ্বের আরেক প্রান্তে জ্বালানি সংকটের কারণে কিউবাজুড়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পুরো দেশ অন্ধকারে ডুবে যায়। হাসপাতাল ও জরুরি সেবায় বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। কিউবা সরকার এ সংকটের জন্য দীর্ঘদিনের জ্বালানির ঘাটতি এবং বিদেশি নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বৈশ্বিক অস্থিরতার নতুন অধ্যায় :

হরমুজ প্রণালিতে হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তাÑ সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আবারও নতুন এক সংকটের দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি পরিবহনপথ নির্মাণের উদ্যোগ, আঞ্চলিক সংলাপ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আপাতত বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে হরমুজ প্রণালির দিকে, কারণ এই সংকীর্ণ জলপথের নিরাপত্তাই এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।