বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার হার কিছুটা কমেছে। তবে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার এখনো কোটি কোটি মানুষের নাগালের বাইরে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বের প্রায় প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজনের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। একই সঙ্গে যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
ক্ষুধা কমলেও সামনে কঠিন পথ : প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা তৃতীয় বছরের মতো বিশ্বে ক্ষুধার হার কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ক্ষুধার হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে। তবুও বিশ্বের প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এখনো অপুষ্টি ও ক্ষুধার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। জাতিসংঘের ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্য অর্জনে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা অনেকের পক্ষেই অসম্ভব : বিশ্বের প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষের পক্ষে পুষ্টিকর খাদ্য কেনা সম্ভব নয়। প্রতিদিন একজন মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ২৮ ক্রয়ক্ষমতা সমতা ডলার, যা চরম দারিদ্র্যসীমার দৈনিক আয়ের চেয়েও বেশি। ফলে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় ক্যালরি পেলেও পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি : বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ দেশে ভর্তুকি দেওয়া হয় প্রধানত চাল, গমসহ শ্বেতসারজাতীয় খাদ্যে। কিন্তু ফল, শাকসবজি, দুধ, ডিম, মাছ কিংবা মাংসের মতো পুষ্টিকর খাদ্যে পর্যাপ্ত সহায়তা না থাকায় মানুষের খাদ্য তালিকায় বৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। এর ফলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফ্রিকাই এখন ক্ষুধার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র : বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের বসবাস এখন আফ্রিকায়। সেখানে প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন। আফ্রিকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের পক্ষে স্বাস্থ্যকর খাবার কেনা সম্ভব নয়। অন্যদিকে এশিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ায় আফ্রিকায় মোট ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা এখনো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুদ্ধ ও সংঘাত নতুন সংকট তৈরি করছে : জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘœ ঘটায় জ্বালানি, সার ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এতে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার নি¤œ আয়ের দেশগুলোর।
ভয়াবহ ক্ষুধার মুখে লাখো মানুষ : বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার হার কমলেও বহু মানুষ এখনো ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মধ্যে রয়েছেন। বৈশ্বিক খাদ্য সংকট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যেখানে অনাহার, তীব্র অপুষ্টি ও মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। গাজা, সুদান, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন, হাইতি ও মালির পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশও ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় : জাতিসংঘ সমর্থিত বৈশ্বিক খাদ্য সংকট প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা শীর্ষ দশ দেশের একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও দেশে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই, তবু মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য নি¤œ ও নি¤œমধ্যম আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, বাজারে নজরদারি বাড়ানো এবং অস্বাভাবিক মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে শুধু খাদ্যের পরিমাণ বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন পুষ্টিসমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রচলিত খাদ্যশস্যের উৎপাদন ঝুঁঁকির মুখে পড়ছে। তাই ডাল, শিমজাতীয় পুষ্টিকর বিকল্প ফসলসহ স্থানীয়ভাবে উপযোগী কৃষি উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণা, উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া সমাধান নয় : বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুধার হার কিছুটা কমলেও খাদ্য নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। কোটি কোটি মানুষ পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত, আর যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিনিরাপদ বিশ্ব গড়তে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

