ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আলহাজ্ব মোকছোদ আলী: যিনি কর্মগুণে অমর মানুষের অন্তরে

মোজাম্মেল হক আলম, লাকসাম
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ০৫:৩০ এএম
ভাইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোকছোদ আলী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

আলহাজ্ব মোকছোদ আলী। যিনি ছিলেন ক্ষণজন্মা একজন দানবীর ও শিল্প-কারখানানির্ভর বিপ্লবের প্রথমদিককার শিল্পযোদ্ধা। জীবদ্দশায় তিনি সৃষ্টি করে গেছেন অসংখ্য শিল্প-কারখানা ও ধর্মীয়সহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লবের অন্যতম স্বপ্নসারথি প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। ওইসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে গেছেন তিনি। মানবহিতৈষী, এতদাঞ্চলের আলোকবর্তিকা, ক্ষণজন্মা এ মানুষটি মরেও সবার হৃদয়ে আজও অমর। গোপনে দান-সদকা, অসহায়দের জন্য গৃহ নির্মাণ, মক্তব-মাদ্রাসা তৈরি, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ালেখার ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করায় শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় এখানকার মানুষ এখনো এই গুণী মানুষটিকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।

এখানকার মানুষ যখন শিক্ষা, বাসস্থান, উন্নত জীবন-যাপন কী; তার দিকে খেয়াল না করে দু-মুঠো ভাতের আশায় সদা উদগ্রীব ছিল, শিক্ষা কী বা পরবর্তী প্রজন্মে তার কী প্রয়োজনীয়তা, তা বোঝার এত দরকার মনে করত না। সবাই নিজ নিজ ভাবনায় বিভোর ছিল। তখনো আলহাজ্ব মোকছোদ আলী ভাবতেন নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে। তিনি ছিলেন বৃহত্তর লাকসামের আপামর জনতার আশ্রয়স্থল, প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু। আমরণ তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন পরকল্যাণে।

ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে নিজ এলাকা ডুরিয়া বিষ্ণুপুরের বাসিন্দাদের জন্য তিনি গড়ে তোলেন আলহাজ্ব জুলফে আলী ও আলহাজ্ব মোমেনা খাতুন এতিমখানা কমপ্লেক্স। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও তিনি নিরলস কাজ করে গেছেন। অজপাড়াগাঁয়ের রাস্তাঘাট উন্নয়নে ও মসজিদ-মাদ্রাসায় অকাতরে দান করতেন গোপনে। অসহায় মানুষের পাশে গোপনে সাহায্যের হাত বাড়ানোই ছিল তার মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

মানবহিতৈষী আলহাজ্ব মোকছোদ আলী অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তার কাছে গিয়ে কেউ খালি হাতে ফিরতেন না। বিশেষ করে সমাজের হতদরিদ্র মানুষ কিংবা পড়াশোনার ব্যাপারে কেউ গেলে সাহায্যের পাশাপাশি তাদের পরামর্শও দিতেন। শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করেই তিনি ক্ষান্ত হননি; নিজের টাকায় বহু মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। গোপন দান-সদকায় তিনি আমাদের এ অঞ্চলে আপামর জনতার কাছে দানবীর হিসেবে পরিচিত। মৃত্যুর ১৯ বছর পরও কুমিল্লার বৃহত্তর লাকসাম উপজেলায় সর্বজনীন ভালোবাসার অমর পুরুষ হয়ে আছেন তিনি।

শুধু বৃহত্তর লাকসাম উপজেলাতেই নয়, পরোপকারী আলহাজ্ব মোকছোদ আলীর গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা দেশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। জনহিতকর কর্মকাণ্ডে অমর হয়ে আছেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটি। সমাজকে আলোকিত করতে তার অবদান অতুলনীয়। দানবীর, জনহিতৈষী আলহাজ্ব মোকছোদ আলী মানবকল্যাণে, শিক্ষা ও দরিদ্রের সেবায় অকাতরে নিজের বিপুল সম্পত্তি দান করেছেন।

পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে স্মরণীয় আলহাজ্ব মোকছোদ আলী। তিনি বৃহত্তর লাকসাম উপজেলা পরিষদের প্রথম সাবেক সফল চেয়ারম্যান। তার সময়কালে লাকসাম উপজেলায় রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট তৈরি করে এলাকার আর্থ-সামজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।

লাকসামকে সুপরিচিত করতে কাজ করেছেন দিন-রাত। ১৯৮৫ সালে লাকসাম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে ১৯৮৭ সালে তিনি লাকসাম হাউজিং এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেন। নিজ এলাকার পাশাপাশি মানবহিতৈষী এ দানবীর ভাইয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দেশের শিল্পাঙ্গনে রেখে গেছেন অনবদ্য অবদান। কীর্তিমান এ মানুষের মেধা ও বুদ্ধিমত্তায় গড়া বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান হাজারো বেকার মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন একজন মানবহিতৈষী, সৎ, কর্মঠ ও সফল শিল্পপতি।

আলহাজ্ব মোকছোদ আলী ১৯৫২ সালে কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানাধীন ডুরিয়া বিষ্ণুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম আলহাজ্ব জুলফে আলী ও মায়ের নাম মরহুমা আলহাজ্ব মোমেনা খাতুন। ১৯৭২ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে মোকছোদ আলী ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার সততা, একনিষ্ঠতায় দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ভাইয়া গ্রুপে রূপান্তরিত হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী শিল্প বিপ্লবে এই মহৎ মানুষ ১৯৯৫ সালে কালচক্র একুশে মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক এবং কালচক্র স্বাধীনতা স্বর্ণপদক পুরস্কারের মাধ্যমে তার ব্যাপক সামাজিক সেবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পান।

মরহুম মোকছোদ আলী নাথেরপেটুয়া কলেজ, মান্দারগাঁও হাই স্কুল, লাকসাম নবাব ফয়জুন্নেছা ও বদরুন্নেছা যুক্ত উচ্চ বিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়েছেন। বৃহত্তর লাকসামের জনপদের মসজিদ-মাদ্রাসাসহ এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই যেখানে তার অবদান নেই। তিনি গরিব, দুঃখী, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার প্রতি কখনো গোপনে আবার কখনো সরাসরি সাহায্যের হাত প্রসারিত করতেন। অনেক গরিব, দুঃখী পরিবারকে তিনি আর্থিক সাহায্যের তালিকা তৈরি করে প্রতি মাসে দান করতেন।

মরহুম মোকছোদ আলী মৌকারার পীর ছাহেবের ভক্ত-অনুরক্ত ছিলেন। লাকসাম পৌরসভার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এতদাঞ্চলের মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি সব উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় জীবনের শেষ অবধি জড়িত ছিলেন। তিনি লাকসামে অসংখ্য স্মৃতি রেখে গেছেন, যা তাকে অমর করে রেখেছে।

পরবর্তী  সময়ে আলহাজ্ব মোকছোদ আলীর দেখানো পথে তার চার ভাইও হাঁটছেন। আলহাজ্ব মজির আহমেদ ও আলহাজ্ব মফিজুর রহমান- এ দুই ভাই এতদাঞ্চলের মানুষের সেবা করতে জনপ্রতিনিধিত্বকে বেছে নিয়েছেন। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি, জনকল্যাণে নিজেদের সঁপে দিচ্ছেন আজ অবধি।

মানবহিতৈষী এই দানবীরের ২৮ এপ্রিল ২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক আয়োজনে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

দানবীর, মানবহিতৈষী, ক্ষনজন্মা প্রয়াত আলহাজ্ব মোকছোদ আলী ২০০৬ সালের ২৮ এপ্রিল সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। তার মৃত্যুতে লাকসাম-মনোহরগঞ্জের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। মহৎ হৃদয়ের একজন মোকছোদ আলীকে হারিয়ে সেদিন এ অঞ্চলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও পূরণ হয়নি। এই দানবীর আজ নেই, তবুও মানুষের হৃদয়ে তিনি অমলিন। নিজ কর্মগুণে মোকছোদ আলী বেঁচে আছেন মানুষের অন্তরে।