ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সংরক্ষণের অভাবে ৩০ শতাংশ পণ্য অপচয়

রহিম শেখ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৫:০৯ এএম
ছবি-রূপালী বাংলাদেশ (গ্রাফিক্স)

বগুড়ার বাজারগুলোতে নতুন আগাম জাতের আলুর ব্যাপক সরবরাহ বেড়েছে। তবে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় হাসি নেই কৃষকের মুখে। গত বছরের তুলনায় বাজারে আলুর দামে বড় ধস নামায় দিশাহারা কৃষক। গত বছর আগাম জাতের আলু প্রতি মণ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর সেই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বর্তমানে নতুন আগাম আলু পাইকারি বাজারে মানভেদে ৭২০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। আবার আলু তোলার ভরা মৌসুমে যখন বাজারে সরবরাহ বেশি থাকে তখন কোল্ড স্টোরেজে জায়গা থাকে না। সংরক্ষণের অভাবে ৫-৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হয় আলু। মোটাদাগে মাঠ থেকে কারখানা পর্যন্ত যে কোল্ড চেইন ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থার দরকার, তা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য অপচয় হয়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

এটি শুধু কৃষকদের ক্ষতি নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোাটি মার্কিন ডলারের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানিতে আরও বৈচিত্র্য আনতে ও পরিমাণ বাড়াতে সরকার খাতটিকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে ১৪৮টি দেশে সুগন্ধি চাল, ফল, সবজি, মাছ, মাংসের পাশাপাশি বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস, জুস, মসলাসহ প্রায় ১৭২ ধরনের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

তবে পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই এলডিসি থেকে উত্তরণকে সামনে রেখে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের কৃষিপণ্য খাত। এলডিসি উত্তরণের পরে এ খাতের রপ্তানিতে সরকারের দেওয়া ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নতুন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। সে জন্য তাঁরা বিকল্প সুবিধার দাবি জানাচ্ছেন।

জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যা বর্তমানে ৮২০ কোটি এবং তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কৃষিপণ্যের বাজারের আকার এরই মধ্যে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র।

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে বছরে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার আয় করছে, যা বৈশ্বিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারের তুলনায় নগণ্য। তবে বাংলাদেশের কৃষি খাতে বিপুল সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে; যা কাজে লাগালে রপ্তানি আয় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো; যেমন থাইল্যান্ড কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। সেখানে এই খাত দেশের মোট জিডিপির ২৩ শতাংশ অবদান রাখে এবং তারা প্রতিবছর ৩৬ বিলিয়ন ডলার কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। অন্যদিকে ভিয়েতনামের ৫ শতাংশ, চীনের ৩৮, ফিলিপাইনের ৩১, আমেরিকার ৭০, থাইল্যান্ডের ৮১ ও মালয়েশিয়ার ৮৪ শতাংশ কৃষি প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে জড়িত। এর বিপরীতে বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের অবদান জিডিপিতে মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। আর এখানেই সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে সরকার কী করছে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কৃষি খাতের সম্ভাবনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রপ্তানি বাড়ানোর জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

কৃষিসচিব আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, বিশ্ববাজারকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে একটি হলোÑ প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার, যারা বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন এবং কর্মরত; অন্যটি হলো বিদেশিদের মূল বাজার। এই দুই ধরনের ভোক্তাদের চাহিদা নির্ধারণের জন্য মন্ত্রণালয় কান্ট্রি-ওয়াইজ গবেষণা পরিচালনা করছে। গবেষণার ফলের ভিত্তিতে একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে, যা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের রপ্তানি কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় এক হাজার কারখানা রয়েছে। তার মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। এর মধ্যে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫০ কারখানা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর মোট ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানির মধ্যে কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের হিস্যা ছিল দেড় শতাংশ।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে, দেশে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার ২০২৪ সালে ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩০ সালে বেড়ে ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। দেশে প্যাকেটজাত খাবারের বাজার ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশের বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ ৫২টি দেশে বাজারসুবিধা পেয়ে থাকে। বিশ্বে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বাজার ১৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ কোটি ডলারের বেশি, যার মধ্যে হালাল খাবারের বাজার ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখনো বিশ্ববাজারে সঠিকভাবে প্রবেশ করতে পারেনি। প্রবাসীদের মধ্যে সুগন্ধি চাল, মসলা, ড্রিংকস ও স্ন্যাকস বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা এশিয়ার দেশগুলোর স্থানীয় মানুষের কাছে এসব পণ্য পৌঁছায় না। এর প্রধান কারণ হলো বিদেশিরা শুধু নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত খাদ্য গ্রহণ করে। তারা জানতে চায়, উৎপাদনের সময় জমিতে জৈব সার বা কোন ধরনের সার ব্যবহার করা হয়েছে। এই শর্ত পূরণ না হওয়ায় বিদেশি বাজারে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি পরামর্শ দেন ফল, সবজি, চাল ও ডাল উৎপাদনে তাদের মানদ- মেনে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে। এতে কৃষি খাত সম্প্রসারিত হবে এবং কর্মসংস্থানসহ অর্থনীতিতে কৃষির অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

তিনি বলেন, দেশে অনেক ছোট উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের যথাযথ সুবিধা দিয়ে রপ্তানি পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকার তাদের বিদেশি মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে পারে। পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণ ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ এলে দেশীয় পণ্যের মানেও গুণগত পরিবর্তন আসবে। দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিচালক আবু মোখলেছ আলমগীর জানান, বিকল্প সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে তারা কাজ করছেন।

এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের মান উন্নয়নে গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কার্গো সুবিধা বৃদ্ধি এবং কুল চেইন ভ্যান নিশ্চিত করা ইত্যাদি। এ ছাড়া ইউটিলিটি বিল হ্রাস এবং করকাঠামো নিয়েও কাজ চলছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ইকতাদুল হক বলেন বলেন, চিপস-চানাচুর-বিস্কুটজাতীয় পণ্য রপ্তানি করে বেশি আয় করা যায় না। সেজন্য এখন উদ্যোক্তারা উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে এগোচ্ছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ নিতে হয়রানি ও অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে।

ফলে প্রতিযোগিতার কারণে রপ্তানি কমছে। যেমন- ভারত থেকে পণ্যবোঝাই একটি কনটেইনার সৌদি আরবে পাঠাতে ভারতীয়দের খরচ হয় ১২শ থেকে ১৩শ ডলার। বাংলাদেশ থেকে একই কনটেইনার পাঠাতে খরচ লাগে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার ডলার। এ কারণে রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগই চলে যায় পরিবহনে। তিনি বলেন, রপ্তানিতে বিদ্যমান প্রণোদনা তুলে নিলে অনেকেই ব্যবসার ঝুঁকিতে পড়বেন। তাই সরকারের উচিত প্রণোদনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার সব সনদ এক সংস্থা থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ১৪৮টি দেশে ১৭২ ধরনের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে ১০৬টি দেশে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়। এ খাতের প্রধান পাঁচ রপ্তানি পণ্যের বাজার হলো  সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। এই পাঁচ দেশেই মোট রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ যায়। সর্বোচ্চ প্রায় ৯৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয় ইউএইতে। এরমধ্যে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে শুধু প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের। দেশ থেকে রপ্তানি হয়ে থাকে মোট ১৭২ ধরনের কৃষিপণ্য।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হওয়া পাঁচটি পণ্য হলো বিস্কুট, নুডলস, ফলের জুস, পরোটা ও চানাচুর। শুধু বিস্কুটই রপ্তানি হয়েছে সাড়ে ৮৮ মিলিয়ন ডলারের। এই পাঁচ পণ্য মিলিয়ে মোট রপ্তানির প্রায় ৪৫ শতাংশ। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রাণ গ্রুপ। গত অর্থবছরে প্রাণ গ্রুপ গত বছরে ৩১৫ মিলিয়ন বা সাড়ে ৩১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তারা জুস অ্যান্ড ড্রিংকস, স্ন্যাক্স, বিস্কুট, কালিনারি, কনফেকশনারি, ফ্রোজেন ফুডসসহ বিভিন্ন পণ্য ভারত, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, ইউকে ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে। প্রাণ গ্রুপের বার্ষিক পণ্য রপ্তানি ৩০ কোটি ডলারের। প্রাণ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। তবে আমরা এখনো সম্ভাবনার ১ শতাংশও কাজে লাগাতে পারিনি। তারা প্রতিনিয়ত উৎপাদন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছেন এবং নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করছেন। এ ক্ষেত্রে সরকার বন্দর সুবিধা উন্নয়ন, ঋণের সুদহার হ্রাস ও জাহাজ ভাড়া কমানোর মাধ্যমে সহায়তা করতে পারে।

রুখবে অপচয় রোধ

উদ্যোক্তা ও কৃষকরা বলছেন, তারা নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এ শিল্পকে টেনে নিচ্ছেন। এখনো কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং হিমাগারনির্ভর পণ্যগুলোর মান নষ্ট হয়ে যায়। ঋণের উচ্চ সুদহার ও কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র খোলার জটিলতা উৎপাদন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও পরিবহনের অভাবে উৎপাদিত ফল ও সবজির ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ নষ্ট হয়। অন্যদিকে এ খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিকই অদক্ষ, যা উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন অর্জনে বড় বাধা হয়ে আছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষি খাতে কাজ করলেও জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ১২ শতাংশ এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের অবদান ১ দশমিক ৭ শতাংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে দেশে প্রতিবছর মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের হিসাবে, এই অপচয়ের আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত ৫০ বছরে দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি দেশের চলমান জিডিপির সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ফসলের ক্ষতি ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, অথচ বাংলাদেশে তা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। তিনি মনে করেন, কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ বাড়ালে এই অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ হার অন্তত ১০ শতাংশে নামানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, রপ্তানি সহজ করতে পণ্যগুলোর জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং গ্লোবাল গ্যাপ সার্টিফিকেট দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাও বহুগুণে বাড়বে।

প্রয়োজন নীতি সহায়তা

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে চলমান সুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগদ সহায়তার পাশাপাশি এ খাতে সরকারের আরও বেশ কিছু সহায়তা রয়েছে। এর মধ্যে আছে ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য করপোরেট করে ছাড়, বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ ছাড়, রপ্তানি আয়ের ওপর ৫০ শতাংশ কর ছাড়, রপ্তানি পণ্যে ভ্যাট অব্যাহতি এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ১ থেকে ৩ শতাংশ শুল্ক ছাড়। এ ছাড়া ২০টি পণ্যে ২০ শতাংশ অর্থায়ন এবং হালাল পণ্যে ২০ শতাংশ প্রণোদনাসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এ ধরনের সহায়তা দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি রপ্তানি বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারও বাধাগ্রস্ত হবে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য দ্বিমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলে সব সেক্টরেই প্রণোদনা কমে যাবে। তাই বিকল্প হিসেবে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করতে হবে। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য লাইসেন্স পেতে প্রতিবন্ধকতা কমানো, চুক্তির নবায়ন সহজ করা, খাদ্যপণ্যের কারখানা বাড়ানোর জন্য নীতি সহায়তা ও ব্যাংকঋণ সহজ করা প্রয়োজন। রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে দেশের দূতাবাসগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, কৃষক ও উদ্যোক্তাদের স্বল্পসুদে ঋণ, যন্ত্রাংশ ও কৃষি উপকরণ আমদানিতে শুল্কছাড় এবং পরিবহন ব্যয়ে ভর্তুকি দিলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় কমবে। ব্যবসার লাইসেন্স ও নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দরে পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা কমানো, সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা এবং আফ্রিকা, আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশের সঙ্গে কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে।

উন্নত কৃষি চর্চা অনুসরণে ফসল উৎপাদন প্রয়োজন

বাংলাদেশের আবহাওয়া শাকসবজি ও মৌসুমী ফল চাষের জন্য উপযোগী। দেশে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ও ফলমূলের ফলন বেড়েই চলেছে। তাই সময় এসেছে এখন নিরাপদ সবজি উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি বাড়ানোর। আর এ জন্য গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস (গ্যাপ) বা উন্নত কৃষি চর্চা অনুসরণে ফসল উৎপাদন প্রয়োজন। এতে উৎপাদন খরচ কমে এবং কৃষি কার্যক্রম টেকসই হয়। পাশাপাশি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে। তাই অতি দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশে গ্যাপ কার্যক্রম শুরু করা অত্যাবশ্যক।

শেকৃবির অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় সকলেরই দায়িত্ব খাদ্যকে নিরাপদ এবং মানসম্পন্ন রাখা। উত্তম কৃষি চর্চা সারা পৃথিবীতে নিরাপদ কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের বিষয়টি কঠোরভাবে অনুসরণ করে। উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে খাদ্য শৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে বাছ-বিচারহীন বালাইনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার, ভারী ধাতব পদার্থের উপস্থিতি, অণুজীবের সংক্রমণ ইত্যাদি খাদ্য বা ফসলকে অনিরাপদ করে। এ সব কারণে নিরাপদ খাদ্যপণ্য প্রাপ্যতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদনের শুরু থেকে সংগ্রহ, সংগ্রহোত্তর ও প্রক্রিয়াকরণ যেমন- মাঠ হতে সংগ্রহ, প্যাকেজিং, পরিবহন ইত্যাদি পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজন।

এ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বিদেশি মূলধারার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে আমাদের অন্যতম প্রধান বাধা হলো গ্যাপ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস) না মানা। পোশাক খাতে যেভাবে কমপ্লায়েন্স মানতে হয়, কৃষি খাতেও একই মান বজায় রাখতে হবে। আমাদের কৃষিপণ্য এখনো মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘিরে আবর্তিত, কিন্তু বৈশ্বিক ভোক্তা ধরে রাখতে হলে মানসনদ, সাপ্লাই চেইন ও পরিবহন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন জরুরি।’

উদীয়মান পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য

নারী-পুরুষের সমানহারে কর্মে অংশগ্রহণ এবং নাগরিক জীবনে নানা ব্যস্ততার কারণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে দেশে বিদেশে। ফলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা দেশকে বহুমুখী রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এ সব খাদ্যের মধ্যে রয়েছে রুটি, বিস্কুট, আলুপুরি, পাঁপড়, কনফেকশনারি পণ্য, নুডলস, জুস, ঝালমুড়ি, চানাচুর জাতীয় শুকনা খাবার, জ্যাম, জেলি, আচার ও পানীয়। এসব পণ্যের ভোক্তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ প্রায় দুই কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। অন্যদিকে ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান আমাদের পণ্যের ভালো ক্রেতা।