ব্যাংকে না গিয়েও যে আর্থিক সেবা মিলবে, এমন আলোচনা ১৫ বছর আগেও শুরু হয়নি। নব্বইয়ের দশকে যখন দেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হয়, এই ফোনই যে একসময় অনেক আর্থিক লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠবে, এমন পূর্বাভাসও তখন কেউ দেয়নি। আর দেড় দশক আগে যখন মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবা (এমএফএস) বা মোবাইল ব্যাংকিং শুরু হয়, তখন এই সেবার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তবে এই সময় পর বাস্তবতা হলো বিকাশ, রকেট, উপায়, নগদের মতো সেবা এখন প্রতি মুহূর্তের আর্থিক প্রয়োজনে অপরিহার্য অংশ। হাতের মুঠোফোনটিই এখন নগদ টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখন এসব সেবার গ্রাহক। সারা দেশে এসব সেবায় নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ। এখন মোবাইল ব্যাংকিং শুধু টাকা পাঠানোর মাধ্যম না। এর ব্যবহার হচ্ছে সব ধরনের ছোট ছোট লেনদেনে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমা করতে এখন আর এজেন্টদের কাছেও যেতে হচ্ছে না। ব্যাংক বা কার্ড থেকে সহজেই টাকা আনা যাচ্ছে এসব হিসাবে। আবার এসব হিসাব থেকে ব্যাংকেও টাকা জমা শুরু হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়ী আমানতের কিস্তিও জমা দেওয়া যাচ্ছে। এর ফলে একটি মুঠোফোনই যেন একেকজনের কাছে নিজের ব্যাংক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করে। পরে এটির নাম বদলে হয় রকেট। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএফএস সেবা চালু করে বিকাশ। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক ব্যাংক এ সেবায় এসেছে। তবে বর্তমানে এ সেবায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নগদ। এ সেবাটির নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি। এ ছাড়া বর্তমানে মাই ক্যাশ, এম ক্যাশ, উপায়, শিওর ক্যাশসহ ১৩টি ব্যাংক এ সেবা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। ওই বছরের নভেম্বর মাসে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে লেনদেন এক লাখ ৫৮ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে লেনদেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা ও আগস্টে লেনদেন হয়েছে এক লাখ ৫১ হাজার ১০২ কোটি টাকা। মূলত গত বছরের জুন মাস থেকেই ক্রমাগতভাবে বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা বিতরণ, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোসহ (রেমিট্যান্স) বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাধ্যমটি। দেশে বর্তমানে বিকাশ, রকেট, নগদসহ ১৩টি এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আছে। গ্রহীতার সংখ্যা ২৪ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে নগদের তথ্য বাদ দিয়ে দেয়। সে হিসেবে গত জানুয়ারি মাসে এমএফএসে গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৪৯ লাখ। নগদ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, তাদের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। সব মিলিয়ে নিবন্ধিত এমএফএস গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখের অধিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় বছরে এমএফএসে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৪১৫ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেন। এরপরে এগিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মার্চেন্ট পেমেন্ট, বেতন পরিশোধ, পরিষেবা বিল, সরকারি ভাতা, টকটাইম ও প্রবাসী আয়-সংক্রান্ত লেনদেন। হাতের মোবাইলটিই এখন একটি ব্যাংক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগাযোগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে মোবাইল ফোন। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস মাধ্যমে প্রতিদিন এখন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। এসব লেনদেনে অনেক সময় কারো সহায়তার প্রয়োজন হচ্ছে না। কারণ গ্রাহক নিজেই নিজের হিসাবে টাকা জমা করে অন্যকে পাঠানোর পাশাপাশি কেনাকাটাও করতে পারেন। যেমনÑ মোবাইল ফোনে রিচার্জ, বিভিন্ন কেনাকাটা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া ও পরিষেবার বিল পরিশোধ, টিকিট ক্রয় ইত্যাদি। পাশাপাশি এখন অর্থ স্থানান্তর, প্রবাসী আয় গ্রহণ, সরকারি ভাতা ও বৃত্তি বিতরণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেতন-বোনাস প্রদান এবং ব্যাবসায়িক লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠছে এসব সেবা। নগদে বাংলাদেশ ব্যাংক নিযুক্ত প্রশাসক মো. মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, ঈদের আগে একদিনে দুই হাজার ১৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকার লেনদেন করে লেনদেনের নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে ডাক বিভাগের মোবাইলে আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ। আমরা বিশ^াস করি, দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ^াসের কারণেই লেনদেনের এই রেকর্ড গড়া সম্ভব হয়েছে। ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন প্রতিষ্ঠান হিসেবে, বর্তমানে নগদ আরও উন্নত সেবা দেওয়ার কারণে গ্রাহকের আস্থা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে লেনদেনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ‘মানুষের হাতে থাকা মোবাইল ফোনই এখন ব্যাংক। মোবাইল ফোনটিই হয়ে উঠেছে সব ধরনের লেনদেনের অপরিহার্য মাধ্যম। এসব লেনদেনের হিসাব খুলতে কোথাও যেতে হয় না। গ্রাহকেরা ঘরে বসেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট খুলে লেনদেন করতে পারছেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল পরিশোধ, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, বেতন-ভাতা প্রদান, সরকারি ভাতা গ্রহণ, প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) গ্রহণসহ নানাবিধ সুবিধা মোবাইল ব্যাংকিংকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। বর্তমানে বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশ, মাইক্যাশ, শিওরক্যাশসহ ১৩টি প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এমএফএস ব্যবস্থার মাধ্যমে পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ছাড়া গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী ও গৃহপরিচারকদের বেতনও এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। যার ফলে দিন দিন নগদ টাকার লেনদেন কমে আসছে। এ প্রবণতা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।’

