গত এক বছরের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। কেননা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং করপোরেট বিনিয়োগে স্থবিরতার মধ্যে দেশে ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যক্তিগত ব্যয়, এমনকি দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও এখন আগের তুলনায় বেশি মানুষ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। ফলে উচ্চ সুদের হার বহাল থাকলেও ভোক্তা ঋণের চাহিদায় ভাটা পড়েনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিকভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংক খাতে মোট ভোক্তা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। ফলে মাত্র তিন মাসেই ভোক্তা ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
আর এক বছর আগে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, যা খাতটির ধারাবাহিক সম্প্রসারণেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তা ঋণের এ প্রবৃদ্ধি কেবল মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন নয়; বরং মূল্যস্ফীতির চাপে সংসারের ব্যয় সামাল দিতে অনেক পরিবার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে করপোরেট খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও ব্যক্তিগত ঋণ বিতরণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ প্রান্তিকে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আবাসন খাতের ঋণ। ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
বেতননির্ভর ব্যক্তিগত ঋণ বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ২২ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক ঋণ বেড়ে ১৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদি ব্যক্তিগত ব্যয় মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এ ছাড়া জমি কেনার ঋণ বেড়ে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা, মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনার ঋণ বেড়ে ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণে। এ ধরনের ঋণের পরিমাণ এক প্রান্তিকেই ২২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবীর জন্য দেওয়া ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণও বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটারসহ গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার ঋণ সামান্য কমেছে। এ খাতে ঋণ নেমে এসেছে ৩৪ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকায়, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৩৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা বলছেন, কয়েক বছর আগেও ভোক্তা ঋণ মূলত টেলিভিশন, ফ্রিজ, মোটরসাইকেল বা অন্যান্য ভোগ্যপণ্য কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর ব্যবহার অনেক বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে, বিদেশ ভ্রমণ, পেশাগত ব্যয়, বাসা সংস্কার, এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহেও মানুষ ব্যাংকের ব্যক্তিগত ঋণ নিচ্ছেন।
তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছে। এখন প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণই হয়ে উঠছে অন্যতম ভরসা। অন্যদিকে তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার থাকা সত্ত্বেও ভোক্তা ঋণের চাহিদা স্থিতিশীল থাকায় ব্যাংকগুলোও এ খাতে ঋণ বিতরণ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, স্বল্প অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিপণন কার্যক্রম ভোক্তা ঋণের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি এখনো প্রত্যাশিত নয়। একই সঙ্গে বড় করপোরেট ঋণে ঝুঁকিও বেড়েছে। ফলে অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা অর্থায়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। কারণ এ ধরনের ঋণ দ্রুত বিতরণ করা যায়, ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে ছড়িয়ে থাকে এবং ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।

