অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নীতিগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে তারা ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমানো এবং রেমিট্যান্সকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে নীতিনির্ধারক, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, আর্থিক খাতের প্রতিনিধি ও গবেষকরা অংশ নেন।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার তার বক্তব্যে জানান, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে। এই অর্থ শুধু ভোগে ব্যয় না করে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করার জন্য নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতে এখনো ডিজিটাল বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ওমানে বসবাসরত প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশির অনেকেই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে এখনো হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার এবং পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক।
বজলুল হক খন্দকার বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতার মধ্যে লেনদেন আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য হবে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত রেমিট্যান্সে কম খরচে তাৎক্ষণিক পেমেন্ট করিডর গড়ে উঠলে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং প্রবাসীরা কম খরচে অর্থ পাঠাতে পারবেন।
তিনি জানান, এ বিষয়ে হতে যাওয়া গবেষণায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাংলাদেশের পেমেন্ট অবকাঠামো, বাজারের প্রণোদনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করা হবে। এর ভিত্তিতে যৌথ ও কম ব্যয়ের পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার নীতিসুপারিশ প্রণয়ন করা হবে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং স্বচ্ছ রেমিট্যান্স প্রবাহকে উৎসাহিত করবে।
ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, রেমিট্যান্সকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনতে পারলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। গবেষণায় অভিবাসীরা কেন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বেছে নেন- খরচ, বিনিময় হার, লেনদেনের গতি, আস্থা, নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাপকের সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ- এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হবে। তিনি জানান, বিশ্বের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ওপর জরিপ চালিয়ে অনানুষ্ঠানিক রেমিট্যান্সের ব্যবহার এবং আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল চ্যানেল ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হবে। এর ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত নীতিপদক্ষেপ নিতে সহায়তা মিলবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করতে এবং দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে।
তিনি জানান, ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের ব্যবহার বাড়াবে, লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে ও কর পরিপালনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য শক্তিশালী সুশাসন, উপযুক্ত বাণিজ্যিক প্রণোদনা, টেকসই মূল্য নির্ধারণ, কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ও নির্ভরযোগ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক মোজালুপ প্ল্যাটফর্মে আইআইপিএস উন্নয়ন করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা ও ভবিষ্যতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ডিজিটাল অবকাঠামোর আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া এই ব্যবস্থায় ফিচার ফোন ব্যবহারকারীরাও সেবা নিতে ও সহজে হিসাব খুলতে পারবেন এবং তাজামা টুলকিটের মাধ্যমে জালিয়াতি প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে।
বিকাশের রেমিট্যান্স, ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও কমার্শিয়াল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ শেখ ইবনে জিলানী বলেন, একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে বেসরকারি খাতের প্ল্যাটফর্মগুলোকে যুক্ত করার বড় সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য ভোক্তা সুরক্ষা, সাশ্রয়ী সেবা ও ব্যবহারকারীর আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা, নিয়ন্ত্রক প্রস্তুতি, ভোক্তা সুরক্ষা, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত ও সহজ রেমিট্যান্স সেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন।
সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের সম্মানীয় ফেলো ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং নগদবিহীন অর্থনীতিতে উত্তরণকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যা প্রতি বছরই বাড়ছে। তাই ডিজিটাল পেমেন্ট সম্প্রসারণ শুধু প্রযুক্তিগত নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কমাতে সাময়িক প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অনাবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা চালু করা গেলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেশে আনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন