শ্রাবণের আকাশ আজ যেন কোনো শিল্পীর ক্যানভাস। হঠাৎ করেই ধূসর মেঘ ভেঙে পড়ে রাজ্যের সমস্ত সবুজে। ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে শরীর ভিজে যায়, ভিজে যায় পরনের পোশাকও। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? বৃষ্টিঝরার ছন্দ, টিনের চালে শব্দের টংকার, কদম ও মাটির গন্ধ প্রকৃতির মৃদু কোলাহল রেখে যায় আমাদের হৃদয়ে। বর্ষার এই সৌন্দর্য কেবল অনুভবে বন্দি রাখার জিনিস নয়, চাইলে আমাদের প্রতিদিনের পোশাকের নকশায়ও এর রূপ ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। বসন্ত, শীত কিংবা গ্রীষ্মের বৈচিত্র্য অনুযায়ী ফ্যাশন সচেতন মানুষ ঠিকই আলাদা আলাদা ধরন ও নকশার পোশাক পরেন। তাহলে বর্ষার মতো কাব্যিক ঋতুতে প্রকৃতির আবহসংবলিত ভিন্ন ঢং, রং ও গড়নের পোশাক ব্যবহার করবেন না, তা কি হয়? এ মৌসুমে দৈনন্দিন চলাফেরায় স্বচ্ছন্দ ধরে রাখতে এবং পোশাকে বৈচিত্র্য আনতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউসগুলো বাজারে এনেছে নতুন নকশার পোশাক। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মেহরুন নিশি
স্নিগ্ধতার নকশা
বর্ষার পোশাক নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ রঙের সঠিক নির্বাচন। গরমের প্রখরতায় যেমন সুতি কিংবা হালকা রং প্রাধান্য পায়, বর্ষায় তেমনি প্রকৃতি ও মেঘের রঙের ছোঁয়া পোশাকে নিয়ে আসা চাই। এ মৌসুমে স্নিগ্ধ ও আরামদায়ক রং ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে বলেন ডিজাইনাররা। ফ্যাশন ডিজাইনারদের মতে, এ সময় খুব গাঢ় রঙের চেয়ে নীল-সাদা, সাদা-ধূসর, সবুজ-নীল অথবা হালকা গোলাপির সমন্বয় পোশাকের মোটিভে দারুণ ফুটে ওঠে। বর্ষার রং বলতে যা বোঝায়, ময়ূরকণ্ঠী নীল, মেঘের ছাই বা অ্যাশ, ধানি সবুজ কিংবা হালকা আকাশি রংই এই মৌসুমে বেশি মানানসই। হালকা বা স্নিগ্ধ রঙের প্রাধান্য দিলে পোশাকে যেমন দৃষ্টিনন্দন ভাব আসে, তেমনি তা আপনাকে ভিড়ের মাঝেও করে তুলবে ট্রেন্ডি ও মার্জিত। রং বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করলে খুব সাধারণ কাটছাঁটের পোশাকও যেকোনো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
মেটেরিয়াল নির্বাচন
বর্ষাকালের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলোÑ হুটহাট বৃষ্টিতে পোশাক ভিজে যাওয়া। তাই এ মৌসুমে কাপড়ের ফ্যাব্রিক বাছাই করা উচিত অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। বিশেষজ্ঞরা এ সময় এমন কিছু কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দেন যা হালকা-পাতলা এবং আর্দ্রতা প্রতিরোধী। পোশাক ভিজে গেলেও যাতে দ্রুত শুকিয়ে যায়, এই বৈশিষ্ট্যটি বর্ষার ফ্যাশনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। নারীদের জন্য এই ঋতুতে সবচেয়ে উপযোগী ফ্যাব্রিক হলো:
সিল্ক ও হাফ-সিল্ক : দেখতে অভিজাত এবং বেশ দ্রুত শুকিয়ে যায়।
জর্জেট ও শিফন : হালকা, বাতাসের মতো ওড়ানো এবং বৃষ্টিতে ভিজে গেলেও কোনো রূপ নষ্ট হয় না।
মসলিন ও টিস্যু : উৎসব বা রাতে যেকোনো অনুষ্ঠানে পরার জন্য অত্যন্ত আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময়।
সুতি কাপড় গ্রীষ্মের জন্য আদর্শ হলেও বর্ষায় ভারী সুতি বা মোটা খাদি এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ সুতি কাপড় পানি শুষে নিয়ে ভারী হয়ে যায় এবং সহজে শুকাতে চায় না, যা চলাফেরায় অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে।
শাড়ি থেকে ফতুয়া
বাংলার বর্ষা উদযাপনে বাঙালির চিরায়ত পোশাক শাড়ির কোনো বিকল্প নেই। তবে বৃষ্টির দিনে শাড়ি পরা এবং তা সামলানো কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তাই ফ্যাশন ডিজাইনাররা বর্ষায় শাড়ি পরার ক্ষেত্রে শর্ট হাতা বা স্লিভলেস ব্লাউজ ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যা চলাফেরায় বাড়তি স্বস্তি জোগায়। রাতের কোনো বিশেষ আয়োজন থাকলে ডিপ-ব্লু বা অ্যাশ রঙের হ্যান্ডপেইন্ট করা মসলিন কিংবা জর্জেট শাড়ি বেছে নিতে পারেন। মেঘলা রাতের আলো-আঁধারিতে হ্যান্ডপেইন্টেড শাড়ির আভিজাত্য এক অন্য মাত্রা যোগ করে।
যারা দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনে একটু হালকা এবং ক্যাজুয়াল পোশাকে অভ্যস্ত, তাদের জন্য ব্লু জিনসের বিকল্প নেই। বর্ষায় ব্লু বা ডার্ক ডেনিম জিনসের সঙ্গে মানানসই:
১. বর্ষার মোটিভে তৈরি হালকা টপস
২. সুতি বা জর্জেটের ক্যাজুয়াল টি-শার্ট
৩. আধুনিক কাটের শর্ট কুর্ভি বা শর্ট শার্ট
৪. রঙিন প্রিন্ট বা অ্যাস্ব্রয়ডারির ফতুয়া
ওয়েস্টার্ন ও ফিউশনধর্মী এই পোশাকগুলো একদিকে যেমন বৃষ্টির দিনে চলাফেরা সহজ করে, অন্যদিকে আপনার চেহারায় নিয়ে আসে এক তরুণ ও প্রাণবন্ত ভাব।
বর্ষার সাজগোজ
বর্ষায় কেবল পোশাকেই নয়, মেকআপ ও রূপচর্চাতেও আনতে হবে বিশেষ পরিবর্তন। মেঘলা দিনের আর্দ্র আবহাওয়ায় অতিরিক্ত মেকআপ গলে গিয়ে দেখতে বেমানান লাগতে পারে। তাই রূপ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার সাজ হওয়া উচিত একেবারেই সাদামাটা ও হালকা।
ভারী ফাউন্ডেশন বা ঘন মেকআপের পরিপূরক হিসেবে একটি হালকা বিবি ক্রিম বা ওয়াটারপ্রুফ কম্প্যাক্ট পাউডার ব্যবহার করাই যথেষ্ট। চোখে লাগাতে পারেন ওয়াটারপ্রুফ কাজল বা আইলাইনার, যেন বৃষ্টির ছাঁটে তা লেপে না যায়। ঠোঁটের জন্য নুড, স্যালমন পিঙ্ক বা হালকা লিপগ্লস বেছে নিতে পারেন। চুলে খুব বেশি জটিল বাঁধন না দিয়ে বরং ক্যাজুয়াল খোঁপা, বেণি কিংবা হাফ-আপ চুল বাঁধার ধরন বেছে নিলে তা বর্ষার মেজাজের সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়।
অনুষঙ্গ ও গহনা
পোশাক আর রূপচর্চার পাশাপাশি সামগ্রিক রূপকে ফুটিয়ে তুলতে অনুষঙ্গ বা জুয়েলারির ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্ষার সাজে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে বেছে নিতে পারেন শখের রঙিন চুড়ি ও সুতার কিংবা বিডসের তৈরি সুন্দর দীর্ঘ মালা। প্রকৃতির ছোঁয়া ধরে রাখতে কাঠের বা কাপড়ের গহনাও হতে পারে চমৎকার অনুষঙ্গ। গহনার ঝুলিতে আরও যুক্ত হতে পারে বিশেষ কিছু উপাদান:
মুক্তা ও ঝিনুক : সাগরের উপাদানে তৈরি গহনা বর্ষার আবেশকে চমৎকারভাবে প্রতিফলিত করে।
কড়ি ও শামুক : এথনিক বা ফিউশন পোশাকের সঙ্গে কড়ি ও শামুকের গহনা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষক লাগে।
পালকের গহনা : রঙিন পাখির পালক দিয়ে তৈরি কানের দুল বা গলার লকেট সাজে নিয়ে আসে এক ধরনের চঞ্চল ও স্নিগ্ধ আমেজ।
গাঢ় রঙের শাড়ি কিংবা ক্যাজুয়াল পোশাক, যেটির সঙ্গেই এই হালকা ও ট্রেন্ডি গহনাগুলো যুক্ত করবেন, বর্ষার নিজস্ব আমেজ আপনার পুরো লুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
স্বাচ্ছন্দ্যময় ফ্যাশনভাবনা
ফ্যাশন মানে কেবল ট্রেন্ড অনুসরণ করা নয়; সময়ের চাহিদা, আবহাওয়া এবং নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়াই প্রকৃত ফ্যাশন সচেতনতা। বর্ষার আর্দ্রতার এই দিনগুলোতে হালকা পোশাক, ঝটপট শুকানোর মতো ফ্যাব্রিক, স্নিগ্ধ রঙের মোটিফ এবং সাধারণ মেকআপের মেলবন্ধন আপনাকে রাখবে দিনভর সতেজ ও প্রাণবন্ত। তাই এবার বৃষ্টির দিনে কেবল ঘরে বসে মেঘের খেলা না দেখে, বর্ষার আমেজ মেখে নিন পরনের কাপড়েও। রং, ফ্যাব্রিক আর সঠিক অনুষঙ্গের মেলবন্ধনে এ বর্ষায় নিজেকে সাজিয়ে তুলুন অনন্য, স্নিগ্ধ ও সচ্ছল রূপকথায়।

