ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জানাল টিআইবি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৪:৩৫ এএম

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত দেড় বছরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদ পতনের পরও বাস্তবিক অর্থে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি। বরং গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবের পাশাপাশি দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবসমূহ অবহেলিত হওয়া অথবা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারাও তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিপিআই ২০২৫-এর বৈশ্বিক প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এ সময় জানানো হয়, দুর্নীতির ধারণা সূচকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এক ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এবার ১৩তম অবস্থানে। গেল বছর ছিল ১৪তম।

নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক বা করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (সিপিআই) ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর ২০২৪-এর তুলনায় এক পয়েন্ট বেড়ে ২৪ এবং ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী অবস্থানের এক ধাপ উন্নতি হয়ে ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম। ২০১২ সাল থেকে ১৪ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের এবারের স্কোর দ্বিতীয় সর্বনি¤œ। ‘সিপিআই অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ব্যবহৃত ০-১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৮-এর মধ্যে আবর্তিত ছিল। কিন্তু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্কোর ধারাবাহিকভাবে এক পয়েন্ট করে কমে যথাক্রমে ২৪ ও ২৩ হওয়ার পর এ বছর আবার এক পয়েন্ট বেড়ে ২৪ হয়েছে। তবে সিপিআইয়ের প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এবার ২০১২ সালের তুলনায় দুই পয়েন্ট কম স্কোর পেয়েছে, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনি¤œ। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮২টি দেশের মধ্যে কম স্কোর পাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। তিনি বলেন, এ বছর এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন- সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভুক্ত ছিল না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সূচকের এবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশ এমন দেশসমূহের মধ্যে আছে, যারা দুর্নীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনি¤œ স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর (২৪) বৈশ্বিক গড় স্কোর (৪২)-এর তুলনায় ১৮ পয়েন্ট এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় স্কোর (৪৫)-এর তুলনায় ২১ পয়েন্ট কম। এমনকি সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত অঞ্চল সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর চেয়েও বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর ৮ পয়েন্ট কম। তাই বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা অতি-উদ্বেগজনক। এ বছরের সিপিআই অনুযায়ী ১৮২টি দেশের মধ্যে পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশসমূহের গড় স্কোর ৭১, ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশসমূহের গড় স্কোর ৪৭ এবং অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের গড় স্কোর ৩২। এর অর্থ ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রসমূহের তুলনায় পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ অনেক বেশি কার্যকরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে

বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও জাতির প্রত্যাশা পূরণ হয়নি এবং রাষ্ট্রসংস্কারের ভিত্তি এখনো নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে, আমলাতন্ত্রের একটি অংশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোÑ জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বাধা দিচ্ছে। দুর্নীতির এই ভয়াবহ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের পছন্দমতো ‘পিক অ্যান্ড চ্যুজ’ পদ্ধতিতে সংস্কার না করে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে টেকসই ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘চোরতন্ত্রের অবসান ঘটলেও অর্থপাচার থামেনি, বরং তা পুনঃস্থাপিত হয়েছে।’

২০২৫ সালের সিপিআই অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে পাঁচটি দেশের স্কোর ১ থেকে ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত উন্নতি হয়েছে। বাকি দুইটি দেশের ১ পয়েন্ট করে অবনমন এবং একটি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কার স্কোর সর্বোচ্চ ৩ পয়েন্ট এবং বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপের ১ পয়েন্ট করে উন্নতি হয়েছে। আর ভুটান ও আফগানিস্তানের স্কোর ১ পয়েন্ট কমেছে এবং নেপালের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান সর্বোচ্চ  চৌদ্দ ধাপ, মালদ্বীপ ও ভারতের পাঁচ ধাপ এবং বাংলাদেশের অবস্থানের এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। তবে নেপালের অবস্থান দুই ধাপ, পাকিস্তানের এক ধাপ এবং আফগানিস্তানের অবস্থান সর্বোচ্চ চার ধাপ অবনমন হয়েছে। আর ভুটান এক স্কোর কম পেলেও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভুটান ছাড়া এ বছরও বাকি সাতটি দেশ সূচকের গড় স্কোর ৪২-এর কম পয়েন্ট পেয়েছে। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা বেশ উদ্বেগজনক।

সিপিআই-এ দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০-১০০-এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়। ‘০’ স্কোরকে দুর্নীতির কারণে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ‘১০০’ স্কোরকে দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত বা সর্বাধিক সুশাসিত বলে ধারণা করা হয়। সূচকে অন্তর্ভুক্ত কোনো দেশই এখন পর্যন্ত শতভাগ স্কোর পায়নি। অর্থাৎ দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বনি¤œ, এমন দেশগুলোতে কম মাত্রায় হলেও দুর্নীতি বিরাজ করে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সিপিআই নির্ণয়ে টিআইবি কোনো ভূমিকা পালন করে না। এমনকি টিআইবির গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ সিপিআই-এ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের মতো টিআইবিও দুর্নীতির ধারণা সূচক দেশীয় পর্যায়ে প্রকাশ করে মাত্র। সিপিআই ২০২৫-এর তথ্যসূত্র হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য বিশ্বখ্যাত ১২টি প্রতিষ্ঠানের সর্বমোট ১৩টি জরিপ ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গতবারের মতো এবারও ৮টি জরিপ ব্যবহৃত হয়েছে। জরিপগুলো হলোÑ বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে, গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, বার্টেলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট রুল অব ল ইনডেক্স, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড, ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস এবং ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাসি প্রজেক্ট ডেটাসেটের রিপোর্ট।