কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেডের রপ্তানি-সংক্রান্ত গুরুতর জালিয়াতির তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। এই কোম্পানির ব্যাংকিং চ্যানেলে ২০১৯-২০ করবর্ষের ১১২ কোটি টাকার রপ্তানি সনদ ‘সত্য নয়’ এবং ‘ব্যাংক থেকে ইস্যু করা হয়নি’- এমনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা। বাস্তবে ওই করবর্ষে কোম্পানির রপ্তানি ছিল মাত্র ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকার তৈরি পোশাক।
তথ্যমতে, এই ভুয়া রপ্তানি সনদে ৯৯ কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা দেখানো হয়। কৃত্রিম আয় প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে প্লেসমেন্ট শেয়ারের দাম চারগুণ বাড়িয়ে ২০২১ সালে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন। এই সুবিধাভোগীদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যরাও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভুয়া রপ্তানি সনদ ব্যবহার করে কাট্টলি টেক্সটাইল এনবিআরকে বিভ্রান্ত করেছে এবং প্রায় ২৮ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নিতে সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
এনবিআরের ঢাকা কাস্টমস শাখা জানায়, কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেড ২০২০ সালে ২ লাখ ৬ হাজার ১৬৮ (নিট ওজন) কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। রপ্তানির বিপরীতে আয় করে ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ১৬ ডলার, যা ৮৫ টাকা প্রতি ডলার হিসাবে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ ২৯ হাজার ৭৬ টাকা।
২০২১ সালে রপ্তানি ছিল ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯ কেজি তৈরি পোশাক। যার বিপরীতে রপ্তানি আয় ছিল ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬ ডলার। সেই সময়ে ৮৫ টাকা প্রতি ডলার হিসাবে ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৫১১ টাকার পণ্য রপ্তানি করে। ২০২২ সালে ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৯৮৫ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং সে সময়ের ডলারের হিসাবে ৩৪ কোটি ১৬ লাখ ৯৪ হাজার ২৮৯ টাকা আয় করে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার ছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ। তার মধ্যে ৬ পরিচালকের হাতে ছিল ৪৯ শতাংশ বা ২ কোটি ৬৯ লাখ ৮২ হাজার ৩২৭, মতিউর পরিবারের হাতে ছিল ৩৭ লাখ এবং বাকি ২৮ প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তির হাতে ছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৩টি শেয়ার।
২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি হওয়ার পরে শেয়ার লক-ইনের মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হয় এবং ২০২১ সালে কোম্পানির শেয়ারগুলো চারগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
কাট্টলি টেক্সটাইলের দাখিল করা প্রত্যয়নপত্রটি সম্পর্কে এনবিআরের দাবি, ‘ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা প্রধান মিয়া মো. বরকতুল্লা স্বাক্ষরিত করদাতা কোম্পানির দাখিলকৃত রপ্তানির প্রত্যয়নপত্রটি সত্য নয় এবং প্রত্যয়নপত্রটি ব্যাংক থেকে ইস্যু করা হয়নি। ব্যাংক চিঠি দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে।’
এনবিআরে দাখিলকৃত প্রত্যয়নপত্র অনুসারে কোম্পানির নিট ও ওভেন গার্মেন্টস হিসাবে রপ্তানি পরিমাণ হচ্ছে ১১২ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৯ এবং উৎসে কর কর্তনের পরিমাণ ২ কোটি ৫৪ লাখ ২ হাজার টাকা। প্রকৃত তথ্য হলো, ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৪৯ হাজার ৫১১ টাকার পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে।
এমন আয় প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে কোম্পানির শেয়ারমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই সময়ে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অন্য উদ্যোক্তারা শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেন। লক-ইনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরে ২০২২-২৩ প্রতিবেদনে দেখা দেখা যায়, কোম্পানির ৬ উদ্যোক্তার মোট শেয়ারের পরিমাণ হয়েছে ৩০.৩২ শতাংশ। একই সময়ে অন্য শেয়ারধারীরাও তাদের শেয়ার হস্তান্তর করেন।
চট্টগ্রাম কর অঞ্চল ৩-এর ৪৬ নম্বর সার্কেলের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, একই সময়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ রপ্তানি আয়ের অসত্য সনদ দিয়ে প্রায় ২৮ কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানো অতিরিক্ত রপ্তানির জন্য বিভিন্ন এলিমেন্টের ওপর বাড়তি ২৮ কোটি টাকা করদাবি করে এনবিআর। অন্যদিকে, অডিট আপত্তির শুনানিতে করদাতা কর্তৃপক্ষ উপস্থিত না হওয়ায় ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা এনবিআর জরিমানা করলেও এখনো পরিশোধ করা হয়নি। তবে এনবিআরের দাবি, কর ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকারও বেশি। বিষয়টি নিয়ে রাজস্ব বোর্ড আলাদা তদন্ত শুরু করেছে।
‘কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে শুনানিতে উপস্থিত হতে তিনবার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা উপস্থিত হয়নি’- বলেন চট্টগ্রাম কর অঞ্চল ৩-এর কর কমিশনার মনজুর আলম। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০১৯-২০ করবর্ষের রিটার্নে তথ্য বিবরণীর সঙ্গে কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করেনি। রিটার্নটি ক্রটি-বিচ্যুতির কারণে অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘জরিমানা করা হলেও তারা টাকা পরিশোধ করেনি, তবে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন মতিউর রহমান। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দায়ে বর্তমানে জেলে আছেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ, দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আকতার শিবলী এবং বোন হাওয়া নুর বেগম। তার প্রথম স্ত্রীর পুত্র আহমদ তৌফিকুর রহমান ও মেয়ে ফারজানা রহমান ইস্পিতা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গ্লোবাল সুজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমদ তৌফিকুর রহমান প্রি-আইপিওতে ৭ লাখ শেয়ার (১.২৭ শতাংশ) ধারণ (বিও নম্বর ১২০১৯৬০০৫৩৩৩৩২০৬১) করেন। এ ছাড়া তিনি শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নামে ১.৮২ শতাংশ বা ১০ লাখ শেয়ার ধারণ (বিও নম্বর ১৬০৫৭৬০০৬৪৪৮৩২৫৯) করেন। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডারদের একজন আহমদ তৌফিকুর রহমান।
শাম্মী আখতার শিবলী ১০ লাখ শেয়ার (বিও নম্বর ১২০৫১৫০০৪৭১০৩১৬২) মোট শেয়ারের ১.৮২ শতাংশ ধারণ করেন। হাওয়া নূর বেগম ১০ লাখ (বিও নম্বর ১২০১৯৬০০৫৪৭৯২৯৭১) মোট শেয়ারের ১.৮২ শতাংশ ধারণ করেন।
বিশেষ একটি সূত্র জানায়, কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ায় ২.৫০ শতাংশ হারে এসব শেয়ার কমিশন পেয়েছিলেন বিতর্কিত মতিউর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বিতর্কিত কাজী সাইফুর রহমান।
আইপিও প্রসপেক্টাস অনুসারে, কাট্টলি টেক্সটাইল লিমিটেডের ৬ পরিচালক ৪৯ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে চেয়ারম্যান নাছরিন হকের শেয়ার ৩৯ লাখ ৪১ হাজার ২০০টি বা ৭.১৭ শতাংশ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. এমদাদুল হক চৌধুরীর ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮২ হাজার ৯০৪টি বা ১৯.২৪ শতাংশ, পরিচালক আনোয়ারুল হক চৌধুরীর ২৮ লাখ ৪৮ হাজার ৮৪৮টি বা ৫.১৮ শতাংশ, মোকারম আনোয়ার চৌধুরীর ২৪ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮০টি বা ৪.৫৩ শতাংশ ধারণ করেন।
কোম্পানি হিসেবে ইয়ার্ন অ্যাপারেলস লিমিটেডের ধারণ (নমিনেটেড ওয়াহিদা সাবরিনা ৩৭ লাখ ৬০ হাজার ৬২৫টি বা ৬.৬৪ শতাংশ এবং লাকি কর্ণারের (নমিনেটেড সিপাথ সাবরিনা ৩৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭০টি বা ৬.১১ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নীতিমালা অনুযায়ী, ৩ বছরের শেয়ার লক-ইন নির্ধারিত হয়। ২০১৮ সালে তালিকাভুক্তির পরে তিন বছরপূর্তি হলে ২০২১ সালে তারা শেয়ার বিক্রি করে দেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি দর ছিল ৯ টাকা। মে মাসে তা উত্থান হতে শুরু করে। ৯ মাসের ব্যবধানে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ ৩৯.৯৫ টাকায় অবস্থান নেয়। এরপরে ১৩ নভেম্বর ডিএসইতে ৮.৯০ টাকা দরে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।
২০১৮ সালে আইপিওর মাধ্যমে ৩৪ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করে কাট্টলি টেক্সটাইল। সংগৃহীত অর্থ ‘নয়ছয়’ করার অভিযোগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কমিশনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেয় বিএসইসি। সেই নির্দেশের পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা আর জানতে পারেনি বিএসইসি।
২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের কোম্পানির প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে শেয়ার ধারণের চিত্রে দেখা যায়, চেয়ারম্যান নাছরিন হক ৪.৪৩ শতাংশ, এমডি এমদাদুল হক চৌধুরী ১১.৮৯ শতাংশ, পরিচালক আনোয়ারুল হক চৌধুরী ৩.২০ শতাংশ, মোকারম আনোয়ার চৌধুরী ২.৮০ শতাংশ রয়েছে। নমিনি পরিচালক (ইয়ার্ন অ্যাপারেলস লিমিটেড) ৪.২৩ শতাংশ এবং সিফাত সাবরিনা (লাকি কর্ণার) ৩.৭৭ শতাংশ শেয়ার ধারণ করেন।
২৮ কোটি টাকা কর ফাঁকি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা পোশাক খাতের কোম্পানিটি ২০১৯-২০ করবর্ষে রিটার্নে বিবরণীর সঙ্গে কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করেনি। কোম্পানির ত্রুটিপূর্ণ রিটার্ন নিয়ে অডিট নিষ্পত্তি করতে শুনানিতে ৩ বার কোম্পানির কর্তৃপক্ষকে আহ্বান করা হলেও উপস্থিত হয়নি। পরে তাদের অনুপস্থিতিতে ২৫ লাখ ৪০ হাজার ২৮৮ টাকা জরিমানা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমের রপ্তানি দেখানো হয়েছে ১১২ কোটি ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। এই রপ্তানির পেছনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের কপি ছাড়া এলসি কপি এবং উৎসে কর্তন করের কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এ ছাড়া পণ্য ক্রয় এবং ব্যাংক হিসাব বিবরণী জমা দেওয়া হয়নি। যার কারণে রপ্তানি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।
তবে ব্যাংক হিসাব বিররণী নিয়ে তৈরি হয়েছে সন্দেহ। ব্যাংক হিসাব বিবরণীতে বিরূপ কিছু পরিলক্ষিত হলে কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে এনবিআর।
এনবিআরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৯-২০ করবর্ষে ২৩ কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৬১১ টাকা আয় প্রদর্শন করে এবং প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি হয়। তবে সেই রিটার্নে ৫ ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ে। করদাতা কোম্পানির প্রদর্শিত লেনদেন, উৎপাদন খরচ, প্রশাসনিক খরচ, সম্পদ ক্রয়, লাভ-ক্ষতি ও প্রশাসনিক খরচসহ অন্যান্য ব্যয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক বিবরণীসহ যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ দাখিল করেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০-২১ করবর্ষে মোট ২৭ কোটি ৮৫ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯ টাকা কর ফাঁকি দেয়। কোম্পানির পূর্ববর্তী কর বছর অপেক্ষা ১৫ শতাংশের অধিক কর প্রদর্শন করলেও ১০৮/১০৮(এ) ধারার বিবরণী দাখিল করেনি।
কোম্পানির উৎপাদন খরচ ৮৩ কোটি ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ৪১৪ টাকা এবং প্রশাসনিক খরচ ৩ কোটি ২ লাখ ১৭ হাজার ৬৮৭ টাকা বলা হলেও তা সঠিক নয়। স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণসহ মোট চলতি দায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ৫০ হাজার ৪৩১ টাকার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। স্থায়ী সম্পদের সংযোজন হিসেবে ১৬ কোটি ২৮ লাখ ২৮ হাজার ৯৪২ টাকা প্রদর্শন করা হলেও কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। ফিন্যান্সিয়াল খরচ ৫০ লাখ ৬৯ হাজার এবং ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড খরচ ১ কোটি ১৮ লাখ ৬১ হাজার টাকার একাধিক তথ্য সঠিক নয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানিটি কর রিটার্নে মোট আয় দেখিয়েছে ২৩ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার ৬১১ টাকা এবং টার্নওভার দেখিয়েছে ১১২ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। উৎপাদন ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮৩ কোটি ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৪ টাকা, প্রশাসনিক ব্যয় ৩ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার ৬৮৭ টাকা এবং স্থায়ী সম্পদ সংযোজন ১৬ কোটি ২৮ লাখ ২৮ হাজার ৯৫২ টাকা। অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান ২৭ কোটি ৮৫ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯ টাকা কর ফাঁকি দিয়েছে। ফলে আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর ধারা ১২৪ অনুযায়ী ২৫ লাখ ৪০ হাজার ২৮৮ টাকা জরিমানা করেছে এনবিআর।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০২১ সালে কর-পরবর্তী কোম্পানি মুনাফা করে ৬ কোটি ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা। চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৩ এর ৪৬ নম্বর সার্কেলের বক্তব্য, কাট্টলি টেক্সটাইল এখনো জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেনি। অর্থ আদায়ে তাগাদা দেওয়া বা নোটিশ পাঠানো হয়েছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আবারও জরিমানা করা হবে। এরপর মামলা এবং কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বন্ধের প্রক্রিয়ার দিকে যেতে পারে এনবিআর। ‘এখন পর্যন্ত কোম্পানির কেউ আপিলও করেনি’ বলে জানায় সার্কেল কর্তৃপক্ষ।
ফাঁকির অভিযোগ থাকায় ‘সিকিউরিটিজ আইনে শাস্তি হিসেবে পরিচালকদের শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ এবং জরিমানা করতে পারে’ বলেন ভ্যাট কনসালট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হাসানুল ইসলাম টিপু।
তিনি বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি করার মতো বিভিন্ন অপকর্ম করলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়। দেশি ও বিদেশিদের বিনিয়োগ দেশে কমে যায়, এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়।’
‘২০১৯-২০ করবর্ষে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করলে মুনাফার ওপর ২৫ শতাংশ এবং রপ্তানি করলে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর হার নির্ধারিত ছিল’ বলেন তিনি।
এই কোম্পানির স্থিতিপত্র তৈরি করেছে সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং। তবে ‘কর ফাঁকি দিতে কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান করদাতাকে সহায়তা করলে, যাচাইয়ে তার প্রমাণ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলেন ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসাইন ভুঁইয়া।
কাট্টলি টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. এমদাদুল হক চৌধুরীকে কয়েকদিনে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে কাট্টলী টেক্সটাইলের অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও) মাহফুজার রহমান নিজেকে ‘কর্মক্ষেত্রে নতুন’ বলে রূপালী বাংলাদেশের কাছে দাবি করেন। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ১১২ কোটি টাকার রপ্তানি সনদ ‘সত্য নয়’ এবং ‘ব্যাংক থেকে ইস্যু করা হয়নি’ জানিয়েছে ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা। তাহলে প্রত্যায়নপত্রটি কে দিয়েছে? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমিও শুনেছি, এগুলো অনেক পেছনের খবর। আমার ঊর্ধ্বতনরা এ বিষয়ে আপনাকে জানাতে পারবেন।’ বিএসইসির তদন্ত কমিটি গঠন এবং অতিরিক্ত রপ্তানি দেখানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ‘এসব বিষয়ে আমার কোনো উত্তর নেই’ বলেন মাহফুজার রহমান।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পরিচালক এবং মুখপাত্র আবুল কালাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আইপিওর টাকা অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। সে অনুযায়ী কাট্টলির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সিআইডিকে বলা হয়েছিল।’ ‘নতুন কোনো অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে বিএসইসি’ বলেন আবুল কালাম।

