ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঝুঁকিপূর্ণ ক্রেনে চলছে পায়রা বন্দরের কাজ

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: মার্চ ১১, ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম
পায়রা বন্দর। ছবি : সংগৃহীত

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প পায়রা বন্দর। দুর্নীতির কালো মেঘে আচ্ছন্ন হওয়া সেই বন্দরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের মোবাইল হারবার একটি ক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে ফেলায় একদিকে কমেছে সক্ষমতা, অন্যদিকে হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ। অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও আরম্যাস (RMASS Engineering) ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজ দেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে।

পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরের উচ্চমূল্যের মোবাইল হারবার ক্রেন স্থানান্তরের সময় অনিয়ম ও ভুল প্রযুক্তিগত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ দক্ষতার অভাবে ক্রেনের বুম অংশ কেটে গ্যাস কাটিং করে ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে জোড়া লাগানো হয়েছে। প্রায় ৮৫ টন উত্তোলন ক্ষমতার ক্রেনটি জার্মানির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিবহার (Liebherr) এর, মডেল LHM280) থেকে গত বছর আমদানি করা হয়। ২০১৯ সালে সরবরাহ করে সাইফ পাওয়ার লিমিটেড এবং ২০২৪ সালে তা সংস্কার করা হয়। জোড়া লাগানো ক্রেনের অবকাঠামোগত শক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় স্বাধীন ও প্রযুক্তিগত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বন্দর সংশ্লিষ্ট অনেকে।

প্রকৌশলীদের দাবি, ক্রেনের বুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও লোড বহনকারী। এতে কাটিং বা ওয়েল্ডিং করা হলে ক্রেনের কাঠামোগত শক্তি কমে দুর্বল হয় এবং ভবিষ্যতে ক্রেন পরিচালনার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত নির্দেশনা অনুসরণ না করলে ক্রেনটির নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, মোবাইল হারবার ক্রেন পরিচালনা বা বিচ্ছিন্নকরণে অভিজ্ঞতা ‘আরম্যাস (RMASS Engineering) ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নেই’। তবু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে র‌্যামসকে কাজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, র‌্যামস নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লিবহারের অনুমোদিত প্রতিনিধি নয় এবং এ ধরনের ক্রেন নিয়ে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, প্রায় ৩৫ কোটি টাকা দামের এ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সম্পদ ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রযুক্তিগত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্তে বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত—টেন্ডার মূল্যায়ন ও কাজ প্রদান প্রক্রিয়া, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত যোগ্যতা, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং ক্রেনটির বর্তমান কাঠামোগত নিরাপত্তা ঠিক রয়েছে কি না। দ্রুত স্বাধীন প্রযুক্তিগত পরিদর্শন না করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেনটি ভবিষ্যতে পায়রা বন্দরের কার্যক্রম ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এদিকে, পটুয়াখালীর এই বন্দরে মালামাল ওঠানামার জন্য প্রায় ৪২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মোবাইল হারবার ক্রেন (এমএইচসি) ক্রয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি হয়েছে। দরপত্রের কঠোর শর্ত থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতাহীন একটি চীনা কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

একই সঙ্গে অতিরিক্ত ১৫৮ কোটি টাকার গোপন চুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমএইচসি ক্রেন ক্রয়ের অনিয়মের মধ্যেই অন্য একটি সূত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ‘এইচপি-এনজে’ জয়েন্ট ভেঞ্চারের সঙ্গে আরও দুটি শিপ-টু-শোর বা কোয়ে গ্যান্ট্রি ক্রেন সরবরাহের চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই ক্রেন দুটি উৎপাদন করবে চীনের ‘নানজিং পোর্ট-মেশিনারি অ্যান্ড হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানি লিমিটেড’।

অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে ‘রূপালী বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। হারবার ও মেরিন সদস্য কমোডর মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন চৌধুরী এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অন্যদিকে সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. হারুন-অর-রশীদের সঙ্গে কথা হলে তিনিও দায় এড়িয়ে যান। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবালকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

৪২ কোটি টাকার মোবাইল হারবার ক্রেন ক্রয়ে ভয়াবহ জালিয়াতি সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, যদি দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সক্ষমতার প্রমাণ না থাকে, তাহলে অবিলম্বে এই কার্যাদেশ বাতিল করে পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও জেঁকে বসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।