ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রাণবন্ত হতে পারে প্রথম দিনেই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ

শাওন সোলায়মান
প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

নির্বাচনের ঠিক এক মাস পর বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হবে। শুরুতেই অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তবে এর বিরোধিতা করেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর নির্বাচিত হবেন সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার। এদিনই সংসদে উত্থাপন করা হবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাস করা অধ্যাদেশগুলো। সরকার গঠন করা দল বিএনপি জানায়, প্রাণবন্ত সংসদ গড়তে চায় সরকার। এদিন প্রধান বিরোধীদল জামায়াত-এনসিপি এমপিরাও সংসদে উপস্থিত থাকবেন। তাই জুলাই সনদ, সংস্কার পরিষদের শপথ, জাতীয় নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে জাতীয় সংসদ। এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এবং এর আশপাশের এলাকায় যান চলাচলে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পলায়নের মধ্যে দিয়ে ভেঙে যায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও সবসময় প্রতীক্ষা ছিল পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন এবং সংসদের। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচনের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একাই পেয়েছে ৬৮টি আসন। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় নতুন সরকার। এরপর থেকেই প্রতীক্ষা ছিল সংসদ অধিবেশন শুরুর। অবশেষে বিএনপির নেতৃত্বে আজ শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন।

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ভাষণের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিকতা। গতকাল বুধবার বিএনপির সংসদীয় কমিটির এক বৈঠক শেষে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যায়িত করে তার ভাষণের অধিকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। গতকাল বুধবার দুপুরে সংসদের বিরোধী দলের এমপিদের নিয়ে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেই। স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন যে তাকে দিয়ে ভাষণ দেওয়াচ্ছে আমরা পরিষ্কার নই। এই বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলো কাল দেখবেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ করা হবে। সাধারণত প্রথম অধিবেশনে আগের সংসদের প্রধান স্পিকার সভাপতিত্ব করেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অজ্ঞাত স্থানে এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে রয়েছেন। তাই রাষ্ট্রপতির মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে কোনো সংসদ সদস্যকে অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ক্ষমতা দিয়েছে সংসদে সরকারি দল বিএনপি। অধিবেশনের সভাপতির বক্তব্যের পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। তারপর তাদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। এ সময় অধিবেশন মূলতবি থাকবে। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে আবারও অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। 

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদের প্রথম বৈঠকে উত্থাপন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আছে। উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কোনো অধ্যাদেশ অনুমোদন না করলে সেটার কার্যকারিতা থাকবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, প্রথম দিনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। এই অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে আর কোনগুলো ল্যাপস (বাতিল) হয়ে যাবে।

অন্যদিকে সংসদকে সরকার প্রাণবন্ত করতে চায় বলে জানানো হয়েছে সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে। সরকার একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ গড়ে তুলতে চান বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সংসদের ভেতরে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমরা একটি কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ গড়তে চাই। সংসদে আলোচনা হবে, বিতর্ক হবেÑ সেই আলোচনার মাধ্যমেই বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা হবে। আমরা বিরোধী দলের গঠনমূলক সহযোগিতা কামনা করি।

তিনি আরও বলেন, সংসদের কার্যক্রম ও আচরণবিধি যথাযথভাবে মেনে সংসদ পরিচালনা করা হবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরা হবে। অন্যদিকে আজকের সংসদ অধিবেশন নিয়ে জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধদলও গতকাল বৈঠক করেছেন। তারাও সংসদে সরব থাকার প্রস্ততি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকাসহ আশপাশের সড়কে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়েছে ডিএমপি। গতকাল দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের অধিবেশন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের যাতায়াত থাকবে। ফলে উড়োজাহাজ মোড়, খেজুর বাগান, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদগেট এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর (গণভবন) ক্রসিং এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি যানবাহন চলাচল করবে।

এ কারণে যানজট এড়াতে ট্রাফিক বিভাগ সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সড়কে ডাইভারশন কার্যকর করবে।

ডাইভারশন ও বিকল্প সড়কগুলো হলো : ইন্দিরা রোড থেকে উড়োজাহাজ মোড় হয়ে বেগম রোকেয়া সরণির দিকে যাওয়া যানবাহন ডানে মোড় নিতে পারবে না। এসব যানবাহন সোজা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে মিরপুর রোড দিয়ে গন্তব্যে যেতে হবে।

এতিকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে খেজুর বাগান হয়ে বেগম রোকেয়া সরণিগামী যানবাহন বামে মোড় না নিয়ে ফার্মগেট হয়ে গন্তব্যে যেতে হবে। অন্যদিকে, উড়োজাহাজ মোড় থেকে খেজুর বাগান পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে দক্ষিণমুখী একমুখী যান চলাচল চালু থাকবে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নগরবাসীকে যানজট এড়াতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করার অনুরোধ জানিয়েছে এবং সবার সহযোগিতা কামনা করেছে।