প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে মানবাধিকার ইস্যুতে চিঠি লিখেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ ৯টি মানবাধিকার সংস্থা। চিঠিতে বাংলাদেশে ‘বিদ্যমান জরুরি মানবাধিকার চ্যালেঞ্জগুলো’তে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে র্যাপিট অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির আহ্বান জানানো হয়।
গতকাল সোমবার হিউমান রাইটস ওয়াচ, অ্যামিনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফর্টিফাই রাইটস, আর্টিকেল নাইনটিন, সিপেজি, সিভিকাসসহ ৯টি সংগঠন এ চিঠি লিখেছে। তাদের পক্ষ থেকে একই চিঠি দেওয়া হয়েছে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশে বিদ্যমান জরুরি মানবাধিকার চ্যালেঞ্জগুলো আপনার দৃষ্টি আকর্ষণে আমরা ৯টি অধিকারভিত্তিক সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখছি। আপনার দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো এবং আগের অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আমরা স্বাগত জানাই, যা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার হবে। উদাহরণস্বরূপ, জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্ত, বিচার ও প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এখনো নিখোঁজ অন্তত ২৮৭ জন মানুষের পরিবার তাদের স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিভিন্ন কমিশন মূল্যবান সুপারিশ দিয়েছে, যা আপনার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পূরণে সহায়ক হবে। মামলার তদন্ত এবং ভবিষ্যৎ নির্যাতন প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এতে বলা হয়েছে, যদিও শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত বহু মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ হয়েছে, তবুও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নির্বিচার ও ব্যাপক আটকসহ কিছু লঙ্ঘন অব্যাহত ছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিছুটা উন্নত হলেও সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর গ্রেপ্তার ও হামলার কারণে তা ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। সহিংসতা বৃদ্ধি আইনের শাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এমন এক পরিবেশে নারী ও কিশোরীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা জরুরি, যেখানে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো তাদের স্বাধীনতা সীমিত করতে চায়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, যারা কক্সবাজারের শিবিরগুলো এবং ভাসানচরে ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যেখানে জীবিকা বা শিক্ষার যথাযথ সুযোগ নেই এবং মানবিক সহায়তাও কমে যাচ্ছে। আমরা উপলব্ধি করি যে, আপনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন, যখন বড় ধরনের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চাপ বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও মানবাধিকারের জন্য বিশেষভাবে কঠিন। আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি সম্মান হুমকির মুখে, অর্থনৈতিক সংকট তীব্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লাখ লাখ মানুষের অধিকার বিপন্ন। যদিও প্রতিটি সরকারেরই নিজ দেশের সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হয়, তবুও এটি এমন একটি সময় যখন বাংলাদেশের উচিত শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মানবাধিকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
চিঠিতে একাধিক সুপারিশ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, আপনার দায়িত্বকালকে ইতিবাচক পরিবর্তনের উত্তরাধিকার হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা আপনাকে আহ্বান জানাই। এখন প্রয়োজন পদ্ধতিগত সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বিশেষ করে, নিচে উল্লিখিত বিষয়গুলোতে আমরা আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই এবং কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করছি। মানবাধিকার মানদ- রক্ষায় যেসব আইন ও অধ্যাদেশ সংশোধন বা বাতিল করা সবচেয়ে জরুরি, সেই তালিকা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা যেসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অধিকারকে শক্তিশালী করে এবং সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন, তার তালিকাও শেষে দেওয়া হয়েছে। আমরা স্বীকার করি, সুপারিশগুলোর এই তালিকা দীর্ঘ মনে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সব মানুষের অধিকার সুরক্ষার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপি সরকারের সামনে নানা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এই সময়টিকে মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও আইনগত সংস্কারের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট সুপারিশও দেওয়া হয়েছে।

