এবারের ঈদযাত্রার শেষ দুই দিন বাড়ি যেতে মানুষ যে ভোগান্তির শিকার হয়েছিল, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি ভোগান্তি সহ্য করে তাদের ফিরতে হচ্ছে ঢাকায়। গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা, পথে পথে তীব্র যানজট, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, লঞ্চ-ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড়ের পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়া থেকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়েও মেলেনি স্বস্তি। বেপরোয়া চলাচলের কারণে পথে শিকার হতে হচ্ছে দুর্ঘটনারও। এতে কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ, কারো হচ্ছে অঙ্গহানি।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ঈদযাত্রায় গত ১০ দিনে সারা দেশে মোট ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও সহস্রাধিক।
যাত্রীরা বলছেন, ঈদযাত্রার শুরুর কয়েক দিন ভালো থাকলেও শেষ দিকে এসে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। ফেরার পথেও ছিল একই অবস্থা। নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করা দূরে থাক, উল্টো বাড়ি যাওয়া-আসার পথে নানা ভোগান্তিতে চরম ক্লান্তি হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে হচ্ছে। সড়ক, রেল ও ফেরি দুর্ঘটনার কয়েকটি দুঃসহ ঘটনায় আতঙ্কিতও ছিলেন তারা।
গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে দেখা গেছে, ঈদের লম্বা ছুটি শেষে রাজধানী ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একের পর এক দূরপাল্লার বাস টার্মিনালগুলোতে প্রবেশ করছে। এসব বাসে মূলত বেসরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বেশি ফিরছেন। নাড়ির টানে বাড়ি যাওয়া এসব মানুষ প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে এখন যোগ দিচ্ছেন নিজ নিজ কর্মস্থলে।
কর্মস্থলে ফেরা মানুষেরা বলছেন, কাল রোববার থেকে পুরোদমে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলা। তবে ভোগান্তি কমাতে আগেভাগেই ফিরছেন তারা। তবে এতেও খুব ভালো অভিজ্ঞতা নয় তাদের। ফেরার পথে যানজট, অব্যবস্থাপনা আর অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঢাকায় ফেরার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।
কমলাপুরে লালসবুজ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার শাকির জাভেদ বলেন, ‘আমাদের বাসগুলোতে ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি। তবে ঢাকা থেকে ফিরতি যাত্রায় যাত্রী পাচ্ছি কম।’
কুমিল্লা থেকে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবার নিয়ে ঈদ পার করে কর্মস্থলে যাচ্ছি।’
সকাল থেকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আর সদরঘাটে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মে নেমেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ফিরতি যাত্রীরা। কেউ রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, নগর পরিবহনের বাস কিংবা রাইড-শেয়ারিং সেবার মাধ্যমে নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটছেন। তবে লাগেজ হাতে ক্লান্ত যাত্রীদের হাসিমুখে স্বস্তির ফেরাও চোখে পড়েছে।
এদিকে গত কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল সকাল থেকেই সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঢাকামুখী গাড়ির চাপ বেশি দেখা যায়। যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তে সকাল ১১টার দিকে যানজট বেধে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে টাঙ্গাইল অংশে ঢাকামুখী লেনে সকালে একটি দুর্ঘটনার কারণে যান চলাচল বিলম্বিত হতে শুরু করে। যার প্রভাব পড়ে সেতুর পশ্চিম প্রান্তে।
যমুনা সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘যমুনা সেতুর পশ্চিম মহাসড়কে কড্ডার মোড় থেকে সেতু পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে যানবাহনের জটলা রয়েছে। যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে যান চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় পশ্চিম প্রান্তে গাড়ির দীর্ঘ সারি হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যান চলাচল একেবারে থেমে নেই, যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তে ধীরগতিতে যানবাহন চলছে। মহাসড়কে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করায় শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়নি।’
এদিন যাত্রীদের অনেকেই তাদের দুর্ভোগের অভিযোগ করেন। প্রাইভেট কারে পাবনা থেকে টাঙ্গাইল যাবেন ব্যাংক কর্মকর্তা সুলতান হাফিজ ও পায়রা আহমেদ দম্পতি। তারা বলেন, ‘দুপুর ৩টার মধ্যে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হবে। সকাল ১১টায় যমুনা সেতুর পশ্চিমে কড্ডার মোড়ে পৌঁছানোর পর যানজটে পড়ি।’
বাসচালক মিল্টন হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগে বুধবারে যানজটে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় ভিড় অতটা ছিল না। ছুটি দীর্ঘ হওয়ার কারণে পরিস্থিতি ভালো ছিল। তবে ফেরার পথে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’
এ ছাড়া দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের দৌলতদিয়া ৪ নম্বর ফেরিঘাটে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ঈদের পরে যাত্রীসংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ঘাটে যাত্রীদের চাপ রয়েছে। গতকাল সকালে দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকামুখী যাত্রীরা পরিবার পরিজন নিয়ে লাগেজ ও ব্যাগপত্রসহ দৌলতদিয়া ফেরিতে উঠছেন। এ ছাড়া দৌলতদিয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ঢাকামুখী যাত্রীবাহী বাসগুলো নদী পারাপারের অপেক্ষায় আটকে আছে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে এ নৌরুট দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের মনে ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় ভীতির কথা জানিয়েছেন যাত্রীরা।
মাগুরা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘাটে আসা ঢাকামুখী যাত্রী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ভালোভাবে ঈদ করে কর্মস্থলে যাচ্ছি। কয়েক দিন আগে বাসডুবির ঘটনায় ফেরিতে নদী পার হতে মনের মধ্যে একটু ভীতি কাজ করছে।’
তবে সড়কপথে আসা যাত্রীদের অধিকাংশই অভিযোগ তুলেছেন অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে আহনাফ লাবীব পরিবহনে ঢাকায় ফিরেছেন সৈয়দা শাফনাজ ইসলাম বলেন, ‘এমনিতে আমারা ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকায় ঢাকায় ফিরি। তবে এবার ৯০০ টাকা দিয়ে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে।’
নড়াইল এক্সপ্রেস বাসে যশোরের চৌগাছা থেকে ঢাকায় ফিরেছেন এফ শাহেদ। তিনি বলেন, ‘এমনিতে ৮০০ টাকা ভাড়া। কিন্তু ১২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে। শুধু এই বাস নয়, সব বাসেই বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে।’
কুমিল্লার কোম্পানীগঞ্জ থেকে তৃষা পরিবহনে ঢাকায় ফিরেছেন হৃদয় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সাধারণত আমাদের ভাড়া ২৫০ টাকা। কিন্তু সাড়ে তিনশত টাকা দিয়ে ঢাকায় ফিরতে হয়েছে।’
কুলাউড়া থেকে গত বুধবার রাতে উপবন এক্সপ্রেসে ঢাকায় ফেরা নিশীতা মিতু বলেন, ‘আমাদের ট্রেন লাউয়াছড়ায় আসার পর ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে ধীরগতিতে ট্রেনটি প্রায় ৩ ঘণ্টায় লাউয়াছড়া পার হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা দেরিতে ট্রেন ঢাকায় পৌঁছায়। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় আমাদের। ট্রেনে নিয়মিতই এই সংকট চলছে। কবে সমাধান হবে, একমাত্র আল্লাহ জানেন।’
ভোলার চরফ্যাশন থেকে লঞ্চে ঢাকায় ফেরা মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘আমাদের লঞ্চে ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী ছিল। ফলে জীবনের ঝুঁঁকি নিয়েই ফিরতে হয়েছে। ভাড়াও ছিল বেশি।’

