কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে কথিত পির শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা এবং আস্তানায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ফিলিপনগর ইউনিয়নে। নৃশংস ওই হত্যাকা-ের পর আস্তানায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় গতকাল রোববার থেকে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই ঘটনার পর পিরের ভক্তদের মধ্যে অজানা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যদিও এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, এমনকি মামলাও হয়নি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে। পির শামীমের আস্তানায় বিভিন্ন সময়ে পবিত্র কোরআন নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য বা কথাবার্তার একাধিক ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই বক্তব্যের পর তার কর্মকা- ও বক্তব্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হামলায় নিহত কথিত পির শামীম রেজা ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দাফন সম্পন্ন হয়েছে গতকাল রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় পুলিশ প্রহরায়। দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে জানাজা শেষ তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ৩টায় নিহত শামীম রেজার মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে পুলিশ রয়েছে কথিত পিরের আস্তানায়।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে নিজ বাড়িতে পির জাহাঙ্গীর আস্তানা গড়ে তোলেন। সেখানে তার কিছু ভক্ত ও অনুসারী তৈরি হয়। অনুসারীদের নিয়ে নিয়মিত আসরে বসতেন জাহাঙ্গীর। সেখানে কোরআন নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য করেন তিনি। তার এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কয়েকটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ওই ভিডিওগুলো পোস্ট হয়। এরপর এসব ভিডিও এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তারা সম্মিলিতভাবে আস্তানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলা ও ভাঙচুরের একপর্যায়ে পির জাহাঙ্গীরকে মারধর ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় সেখানে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। এলাকার কিছু নেতাও এ হামলার সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ফিলিপনগর এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাতটি আইডি থেকে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট হতে থাকে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা ভিডিওর লিংকগুলো শনিবার সকাল পর্যন্ত ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মেসেঞ্জার ও আইডিতে শেয়ার হতে থাকে। সকাল ৯টার দিকে এই লিংকগুলোর তথ্য পুলিশ কর্মকর্তার নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা ফিলিপনগর এলাকার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। ভিডিওগুলো সম্পর্কে এবং কোনো কিছু হতে যাচ্ছে কি নাÑ এ বিষয়ে আলাপ চলতে থাকে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশের একাধিক টিম ফিলিপনগর গ্রামে টহল দিতে থাকে। দুই থেকে তিনজন পুলিশ সদস্য বেলা ১১টার দিকে দরবারেও উপস্থিত হয়। বেলা ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে হঠাৎ করে গ্রামের পাকা সড়ক দিয়ে শতাধিক মানুষ দেশীয় লাঠিসোঁটা নিয়ে দরবারে গিয়ে হামলা চালাতে থাকেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীও ছিল।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, যে সাতটি আইডি থেকে পির জাহাঙ্গীরের কোরআন নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যের ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়েছে, তার কয়েকজন অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। হামলা ও ভাঙচুরের নেতৃত্বে থাকা ১৫ থেকে ১৮ জনকেও শনাক্ত করা গেছে। গতকাল পির জাহাঙ্গীরের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পাশাপাশি হামলা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ধর্ম অবমাননা করা অন্যায়, তেমনি কোনো মানুষকে হত্যা, বাড়ি ভাঙচুর, হামলা চালানোও অন্যায়। আইনের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে। পুলিশের একাধিক দল সব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এদিকে নিহত শামীম রেজার দাফন দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে তার নিজ আস্তানায় করার জন্য দু-একজন ভক্ত দাবি জানালেও নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সেটা সম্ভব হয়নি। শামীম রেজাকে হত্যার পর থেকে তার আস্তানা ও আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আস্তানা বা দরবার শরিফে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া আস্তানার আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ছাড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
এর আগে ঘটনার পর শনিবার রাতে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে (শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।
শামীম হত্যার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। হামলার ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদ এলাকার বাউলশিল্পী শফি ম-লের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারায় রয়েছে। শফি ম-ল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।
হত্যাকা- সংঘটিত হওয়ার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আলহাজ রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। অপরাধী যে-ই হোক, তার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা কারো জন্য কাম্য হতে পারে না। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন।
গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত কথিত পির শামীম রেজাকে তার আস্তানার দোতলার নিজ কক্ষ থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে দোতলা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে তার ভক্তরা উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় কথিত ওই পিরের কয়েকজন নারী ভক্তসহ অন্তত সাতজন ভক্ত আহত হয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থি ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তার আগে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। ২০২১ সালে একটি শিশুর মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি সে সময় আলোচনায় আসেন। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়।

