ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কাঠগড়ায় উপদেষ্টা নূরজাহান

স্বপ্না চক্রবর্তী
প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ০২:০৬ এএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বিষয়টি হওয়া উচিত ছিল তিনি এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। দেশের স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্বে খুব সংখ্যক নারীই দায়িত্ব পালন করেছেন অগ্রগামী দূত হিসেবে। সেই সুযোগটি পেয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নূরজাহান বেগম। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে একটি উন্নয়নমূলক কাজও তার হাতে বাস্তবায়ন হয়নি। কোনো ধরনের অপারেশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করেননি এই উপদেষ্টার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগ। উপরন্তু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিও রাখেন বন্ধ। ফল হিসেবে দায়িত্ব ছাড়ার কিছুদিনের মধ্যেই হামের সংক্রমণে ঝরছে একের পর এক তাজা প্রাণ। শুধু তার দায়িত্বকালে টিকা না দেওয়ায় দেশজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে হামের সংক্রমণ। এমনকি দায়িত্ব পালনকালে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতেও তিনি নিয়োগ করেছিলেন মুখপাত্র। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং তার আশপাশের সব কর্মকর্তাকে ‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’ বলে অভিহিত করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। তবে দুর্নীতি হলেও কিছু কাজ অন্তত হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুরোপুরি বন্ধ ছিল। আর খেসারত দিতে হচ্ছে নির্বাচিত সরকারকে। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের এমন ব্যর্থতার অভিযোগ নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে এখন দাঁড়াতে হচ্ছে জনগণের কাঠগড়ায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল সোমবার সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে বছরের সর্বোচ্চ ১৭ জন শিশু মারা গেছে। তাদের মধ্যে দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বাকি ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। এ ছাড়া ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৫৪ জন। এছাড়া ১ হাজার ৩০২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৯ জন। ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৬৭ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১ হাজার ৭৯৩ জন। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৮ হাজার ৮৪২ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ২৫ হাজার ১৫১ জন।

একটি সরকারের গাফিলতির কারণে কত বাবা-মায়ের বুক খালি হচ্ছেÑ এই পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ মন্তব্য করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাম, গুটি বসন্ত, রুবেলা বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। কিন্তু এর আগের হামের সংক্রমণের এরকম ভয়াবহতা দেখেনি দেশ। কারণ শুধু একটি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের টিকাদানে অনীহা। অন্যান্য বছর যেমন সরকার সরাসরি ইউনিসেফকে টাকা দিয়ে দিত টিকার জন্য তারা সে কাজটি করেনি। তারা নিজেরা দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার কথা ভেবেছে। কিছুটা ইউনিসেফ থেকে নেওয়ার কথাও ভেবেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কোনো ভাবনাই বাস্তবায়ন করেনি। ফলে এখন খেসারত দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের প্রাণহানির মাধ্যমে। এর জন্য একমাত্র দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবহেলা।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের স্বাস্থ্য খাত ছিল নানা সংকট, চাপ ও প্রত্যাশার মধ্যে। এই সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই নূরজাহান বেগম। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠতে থাকে। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ তা হচ্ছে জনস্বাস্থ্য সংকট ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা।

এই ব্যর্থতার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে মন্তব্য করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা না দেওয়ার খেসারত এখন আমাদের দিতে হচ্ছে। আমরা সারা দেশে একযোগে টিকাদান কর্মসূচি চালু করলেও টিকার কার্যকারিতা শুরু হতে কিছুটা সময় লাগছে। কিন্তু এ রকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশ অনেক আগেই টিকাদানে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। আমাদের ইপিআই ব্যবস্থা এর জন্য নানা সময় বিশ^জুড়ে আলোচিতও হয়েছে। কিন্তু একটি সরকারের অনীহার কারণে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের। এটা মেনে নেওয়া আসলেই কষ্টের। তবে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি চিকিৎসা দিয়ে হোক, টিকা দিয়ে হোক যেভাবে পারা যায়, এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। আশা করছি কিছুদিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের মানববন্ধনেও বক্তারা দাবি করেন টিকা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা এই সংকটকে তীব্র করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, টিকাদান ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় মৃত্যুহার বেড়েছে এবং এর দায় স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর বর্তায়।

এর বাইরেও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও তার সহযোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। এরই মধ্যে যা নিয়ে কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এখানে সরাসরি নূরজাহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ না হলেও তার সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তার অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরোটা সময় নূরজাহান বেগম ‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’র মতো দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রচ্ছন্ন ইশারায় দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক বনে যান। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, তদবির ও চাঁদাবাজি ছিল তাদের নৈমত্তিক ব্যবসা। দুদক থেকে সম্পদের হিসাব তলবের পাশাপাশি তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদিও অভিযোগ সরাসরি নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে নয়, তবে তার দপ্তরের অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় পরোক্ষ দায় ও প্রশাসনিক নজরদারির প্রশ্ন ওঠে।’

শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা, হাসপাতালভিত্তিক দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিষয় নূরজাহান বেগমও স্বীকার করেছেন। এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘এসব নিয়ন্ত্রণ কি সরকারের একার দায়িত্ব?’ এ বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় তাকে। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, কেনাকাটার অনিয়ম ইত্যাদি বিষয়েও তিনি ছিলেন নির্বাক। কোনো কিছু জানতে চাইলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলতেন, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বলার জন্য একজন মুখপাত্র রয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসা করুন।

নূরজাহান বেগমের সময় হাসপাতালগুলোয় অন্যতম বড় সংকট ছিল চিকিৎসক সংকট (প্রায় ১০ হাজার)। এই সংকট দীর্ঘদিনের হলেও তা মারাত্মক আকার ধারণ করে এই নূরজাহান বেগমের সময়ে।

সম্প্রতি হামে অনেক শিশুর মৃত্যুর জন্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে দায়ী করে দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানায় একটি সংগঠন। গত রোববার রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে হিউম্যানিটারিয়ান ইউনিটি উইথ মোরালিটি (এইচইউএম) আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে বক্তারা এ দাবি জানান। এতে সভাপতিত্ব করেন এইচইউএমের যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল আহমেদ। বক্তব্য রাখেন এইচইউএমের আহ্বায়ক হাসান আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে দেশজুড়ে টিকার সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার দ্রুত কমে যায়। একই সঙ্গে শিশুর অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে। দায়টা কার? অবশ্যই তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার।’

গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন উল্লেখ করে হাসান আহমেদ বলেন, ‘ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, এত বড় বিপর্যয়ের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা তার সঙ্গে একমত জানিয়ে তিন দফা দাবি করছি। দাবিগুলো হলো হামে মৃতদের পরিবারকে ড. ইউনূস ও নূরজাহান বেগমের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিতে হবে। টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার দায়ে দুদকে করা অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করতে হবে। দায়ী ড. ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। মুঠোফোনে পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদক তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আপনার যা খুশি লিখতে পারেন।’