ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

শিক্ষার্থী ধর্ষণের চেষ্টা ক্ষোভে ফুঁসছে জাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২৬, ০১:৩০ এএম

নারী শিক্ষার্থীকে জোরপূর্বক টেনেহিচড়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। এ ঘটনার প্রতিবাদে মশাল মিছিল, বিক্ষোভ, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিÑ সব মিলিয়ে টানটান পরিস্থিতি বিরাজ করছে ক্যাম্পাসজুড়ে। এই বিক্ষোভ পরিস্থিতি শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ।

এদিকে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থী ধর্ষণচেষ্টা ঘটনার চার দিন পেরোলেও এখনো অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তারে র‌্যাব ও পুলিশ কাজ করছে। অভিযুক্তকে ধরিয়ে দিতে গতকাল শনিবার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। তবে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে প্রশাসনের ধীরগতিকে দায়ী করছেন শিক্ষার্থীরা। সিসিটিভি ফুটেজের বরাত দিয়ে তারা বলছেন, ঘটনার আগে ও পরে চার ঘণ্টা অবস্থান করছিল ওই যুবক। অথচ ঘটনার চার দিনেও তাকে আইনের আওতায় আনা যায়নি। 

এদিকে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে শিক্ষার্থীদের বেঁধে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটামের সময় পেরিয়ে যাওয়ায় গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ওই দিন মধ্যরাতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের (ভিসি) বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় প্রক্টরের পদত্যাগ দাবিতে তারা নানা স্লোগান দিতে থাকেন। গতকাল শনিবারও শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি গ্রুপ গতকাল সকাল ১০টার দিকে প্রক্টর অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ মে মঙ্গলবার রাত প্রায় ১১টার দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ফজিলাতুন্নেছা হলসংলগ্ন চারুকলা এক্সটেনশন এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে ঝোপের দিকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। পরে তার চিৎকারে আশপাশের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত যুবক পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ওই রাত থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাতেই শুরু হয় বিক্ষোভ। টর্চলাইট, মশাল আর স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘এই ক্যাম্পাসে আমরা আর নিরাপদ নই।’

এ ঘটনায় গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. জেফরুল হাসান চৌধুরী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। শিক্ষার্থীরা ওই দিনই পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম দেন। সেই সময়সীমা পার হওয়ার পরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শুক্রবার রাত থেকে শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনে নামেন।

শুক্রবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান পয়েন্ট থেকে শুরু হওয়া মশাল মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন আবাসিক হল, চৌরঙ্গী, জাকসু ভবন ও পরিবহন চত্বর এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। পরে বিক্ষোভকারীরা ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। নারী শিক্ষার্থীরাই প্রথমে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পরে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংহতি প্রকাশ করেন। পরে গতকাল সকালে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ প্রক্টর অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন।

আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরাÑ‘এক দুই তিন চার, প্রক্টর তুই গদি ছাড়’, ‘দড়ি ধরে মারো টান, প্রক্টর হবে খান খান’, ‘এক দুই তিন চার, লজ্জা থাকলে গদি ছাড়’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তাজনিন নাহার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই প্রক্টরের সময়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার একটিরও কোনো সুষ্ঠু সমাধান আমরা দেখতে পাইনি। তাই এই ব্যর্থ প্রক্টরকে আমরা আর দায়িত্বে দেখতে চাই না।’

ইতিহাস বিভাগের ৫৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী লামিশা বলেন, ‘প্রক্টর পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা এখানে অবস্থান করব। একই সঙ্গে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।’ অর্থনীতি বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের শিক্ষার্থী বৃত্ত সকাল ৭টায় বলেন, ‘প্রক্টরিয়াল বডির ব্যর্থতার কারণে আমরা রাত থেকে এই অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। প্রক্টরের পদত্যাগ ছাড়া আমরা এখান থেকে সরব না।’ এরপর সকাল ১০টার দিকে প্রক্টর অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের।

আন্দোলন শুরুর পর রাত আড়াইটার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের দাবির যৌক্তিকতা আছে। তবে কোনো অপরাধে প্রক্টরকে অব্যাহতি দিতে হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বহিরাগত কারও অপরাধ হলে তা ফৌজদারি অপরাধ এবং এটি মূলত পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত।’ উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমরা চাই শিক্ষার্থীরা আমাদের সামান্য সময় দিক। কার গাফিলতি আছে, তা তদন্ত কমিটি গঠন করে বের করা হবে।’ তবে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের এই প্রস্তাব ও আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ চলছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অন্ধকার সড়ক, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীর অভাব এবং কিছু নির্জন এলাকা অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চরিত্র থাকলেও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কার্যকর কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

গতকাল বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কয়েক দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, প্রক্টরের পদত্যাগ, নারী নিরাপত্তা জোরদার, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত সিসিটিভি স্থাপন। কিছু শিক্ষার্থী নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের দাবিও জানান।

এদিকে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরে ১৪ দফা নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম গঠন, হটলাইন চালু, সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো, ক্যাম্পাসে প্রবেশে কঠোর নজরদারি, রাতের টহল বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা জোরদার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম ঘটনাটিকে জঘন্য আখ্যা দিয়ে দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলছেন, ঘটনার পরপরই প্রতিবার প্রশাসন নানা পরিকল্পনা দেয়। কিন্তু কয়েক দিন পর সব আগের মতো হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখ দেখা যাচ্ছে। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, ওই ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন।’

এদিকে গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক খুদে বার্তায় জানানো হয়েছে, জাবি শিক্ষার্থী ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ব্যক্তির পরিচয় কেউ জানলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকারীকে পৃরস্কৃতও করা হবে বলে বার্তায় ঘোষণা দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। আশা করি খুব শিগগির ভালো কিছু জানাতে পারব।’

সূত্র বলছে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগেও নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বহুবার আন্দোলন হয়েছে। অতীতের নানা ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে নতুন এ ঘটনা পুরোনো ক্ষত আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।