চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও দেশব্যাপী রাজনৈতিক দখলবাজি দমনে নির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজির দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সমাবেশে জোটের নেতারা বলেন, দেশে অবস্থিত বিদেশি দালালদের চিহ্নিত করতে হবে। ভারত বাংলাদেশকে অশান্ত করার জন্য নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। গতকাল শনিবার রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত এক বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব মন্তব্য করেন জোটের নেতারা। গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন, তীব্র জনদুর্ভোগ লাঘব এবং ফারাক্কা ও পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে রাজশাহীতে এই বিভাগীয় সমাবেশের আয়োজন করে ১১-দলীয় রাজনৈতিক ঐক্য।
ডা. শফিকুর অভিযোগ করেন, বিএনপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনের আগে দুর্নীতি ও অন্যায়ের টুঁটি চেপে ধরার বড় বড় ওয়াদা দিলেও ক্ষমতায় বসার পর সব জায়গায় দুর্নীতির মহোৎসব এবং গায়ের জোরে রাজনৈতিক দখলবাজি চলছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির অতীত প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনাদের নেতা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন দুর্নীতিকে টুঁটি চেপে ধরবেন। কিন্তু আপনারা ক্ষমতাকেন্দ্রে এসেই বললেনÑ যদি সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু নেওয়া হয় তবে এটা চাঁদা হবে না। এই ধরনের আপসকামিতাকে আমরা ধিক্কার জানাই। আজকে আপনাদের আসল পরিচয় জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। আপনাদের নাম ছিল জাতীয়তাবাদী দল, আর এখন সাধারণ মানুষ আপনাদের বলে চাঁদাবাজি দল। একজন চাঁদাবাজকেও আপনারা এখন পর্যন্ত কবজায় বা আইনের আওতায় আনেন নাই। যার ফলে জনগণ আজ বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে যে, মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত সবাই চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রশাসনে যদি দেশপ্রেমিক, নিবেদিতপ্রাণ ও দক্ষ মানুষদের সরিয়ে দিয়ে কেবল দলকানা ও অযোগ্যদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হয়, তবে তার খেসারত শুধু জাতিকে নয়, সবার আগে বিএনপিকেই দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দেশের ব্যাংকিং খাতের চরম দলীয়করণের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি সংবেদনশীল ও সেন্ট্রাল ব্যাংকের জায়গায় আপনারা একজন চরম দলকানা ও অযোগ্য লোককে গায়ের জোরে বসিয়ে দিলেন। একইভাবে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বমানে আসতে পারে নাই বলে একদিকে আপনারা মায়াকান্না করবেন, আবার অন্যদিকে ক্ষমতায় এসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর ও প্রভোস্টদের একযোগে সরিয়ে দিয়ে নিজেদের দলকানা লোকদের বসাবেন, এটা জাতির সঙ্গে স্পষ্ট প্রহসন।
দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে এবং ব্যাংক-বিমা করপোরেশন লুটপাট হওয়ার কারণে বেকারদের দীর্ঘ মিছিল কেবলই বাড়ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একটা জাতি যদি চিংড়ি মাছের মতো শুধু পেছনের দিকে বা ৫৫ বছর আগে কে কী ছিল সেই বাহাদুরির দিকে তাকায়, তবে সেই জাতি জীবনেও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। নদী ও সীমান্ত কূটনীতি প্রসঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের লাল চোখ এবং সাম্প্রদায়িক নীতির তীব্র সমালোচনা করে জামায়াতের আমির বলেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সরকার মাত্র ১৫ দিনের জন্য ভারতকে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ ৫৫ বছরেও সেই ১৫ দিন শেষ হয় নাই। ফলে পদ্মা আজ শুকনা মৌসুমে মরুভূমি আর বর্ষায় ভয়াবহ দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সরকারের পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এটা যেন শুধু লোক দেখানো না হয়, এর পাশাপাশি তিস্তা মহাপরিকল্পনা অবশ্যই দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ভারতকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীকে আমরা সম্মান করি এবং চাই না ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে বিভাজন ও অশান্তি হোক। কিন্তু সেখানে শুধু মুসলিম পরিচয়ে মানুষকে নাজেহাল করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের দিকে লাল চোখ দেখানো হচ্ছে। বন্ধু, মনে রাখবেন এটা তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং শাহ মাখদুমের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের দিকে চোখ রাঙাবেন না, আপনারা শান্তি নিয়ে টান দিলে কারো শান্তিই থাকবে না।’ তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য রক্ষা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, কেউ যদি কালো হাত বাড়ায় তবে ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত তা রুখে দেবে।
নদী ও শাসনতান্ত্রিক সংকট নিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ঘোষণা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ১৫৪টি অভিন্ন নদী আজ মৃতপ্রায়। নদী যদি ঠিকমতো না চলে তবে খালের পানি কোত্থেকে আসবে, তাই আগে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দিতে হবে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা নির্বাচনের আগে তিস্তা পাড়ে বিশাল নির্বাচনি আমেজ তৈরি করলেও এখন তারা রক্তচক্ষুর ভয়ে চুপ করে আছেন। এর পাশাপাশি সরকার ইতিমধ্যে সুশাসনের জন্য জরুরি ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ফেলে দিয়ে অপকর্ম করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে রাজপথ ও জাতীয় সংসদে একই সঙ্গে ১১ দলের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, দেশে অবস্থিত বিদেশি দালালদের চিহ্নিত করতে হবে। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশকে অশান্ত করার জন্য নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। আমাদের দেখতে হবে এখানে শুভেন্দুর কোনো চর আছে কি না। কর্নেল অলি বলেন, এখন দলীয়করণের মাধ্যমে অযোগ্য লোকদের বিভিন্ন পদে বসানো হচ্ছে। আমরা আমাদের ১১-দলীয় ঐক্যের জন্য নেতা বা মন্ত্রী পদ চাইনি; আমরা চেয়েছি সংস্কার। দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভয়াবহ। বিদেশের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের উৎপাদন বাড়াতে হবে। আপনারা যাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন, তাদের অনেকেরই যোগ্যতা নেই। তারা জনগণের নয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। দেশের সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করুন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সহকারী জেনারেল সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও সঞ্চালনা করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন ম-ল। সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদ, জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির সিরাজুল হক, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামীর আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিম আহমদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম।
এদিকে রাজশাহীতে ১১-দলীয় ঐক্যের মহাসমাবেশ শুরুর আগেই সমাবেশস্থলে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব ও পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশ গতকাল বিকেল ৩টায় নগরীর মাদ্রাসা মাঠে শুরু হয়। তবে এদিন দুপুরে সমাবেশস্থলে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলে দলে নেতাকর্মীরা মাঠে প্রবেশ করছেন। খ- খ- মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

