অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকা সংকটের বিষয়ে সতর্ক করতে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন দাবি করেছে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। গতকাল বুধবার এক ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি এ কথা বলেন। রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। কিছু বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ রকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। বিশেষ করে, টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে। এক প্রশ্নের জবাবে রানা বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণ ছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে (অন্তর্বর্তী সরকারের) মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, গত বছর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আমার মনে হয় না এ ধরনের সিদ্ধান্ত এর আগে কখনো নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়টি আপনারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যাচাই করে নিতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের দাবি, ইউনিসেফ হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে তৎকালীন সরকারকে সতর্ক করেনি। এ বিষয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা বলেন, এ মুহূর্তে আমার হাতের কাছে একেবারে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ নেই। তবে তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হবে। আমি এটুকু জানি যে, আমরা ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি, যার মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পৌঁছেছিল। আমরা আশা করেছিলাম যে, যিনি নতুন করে এই দায়িত্ব পাবেন তার ডেস্কে চিঠিটি থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসার জন্য বারবার চাপ দিয়েছি। একইসঙ্গে আমি বলতে পারি, আমি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা এবং কর্মীদের সঙ্গে অন্তত ১০ বার বসেছি। আমি এবং আমার কর্মীরা বলেছি, আমরা চিন্তিত। আমার মুখ দেখে বুঝুন, আমি চিন্তিত যে, আপনারা টিকার সংকটে পড়তে যাচ্ছেন। এটা স্পষ্ট ছিল যে, দেশে টিকা আনতে না পারলে সমস্যা তৈরি হবে। গত দুই বছরে বাংলাদেশে কোনো টিকা সংকট ছিল কি না জানতে চাইলে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, আমরা ২০২৪ সালেই টিকার সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আমরা আগেভাগেই সতর্ক করছিলাম এবং ক্রমাগত মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে, তারা সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঘটনার পর ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী আলোচনা এ ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমরা খতিয়ে দেখব কেন অনেক বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ শিশু টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। তিনি এই সংখ্যাটিকে ‘মোটা দাগের অনুমান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও প্রাক-বিদ্যালয়, প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো জায়গাগুলোতে শিশুদের একত্র করতে আমাদের সক্ষমতা আমরা ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নিশ্চিত হাম ও হাম উপসর্গে ছয়জনের মৃত্যু : গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো হামবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ২৭০ এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৮৫৬। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা ১৩৮। গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা আট হাজার ৬৭ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৫ হাজার ১২৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪১ হাজার ১২০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২০ মে পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে মোট ৪০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২০ মে পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে দেশে হামের বিস্তার ও টিকা নিয়ে সরকার মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে বলে দাবি করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, টিকা বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্বাস্থ্য খাতের জরুরি সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাদের অভিযোগ, হাম পরিস্থিতি ও টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। ফলে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এদিকে তারা যখন এমন অভিযোগ করছেন তখনো হামে আক্রান্ত হয়ে এবং উপসঙ্গে দেশে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকা সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে ৫-৬টি চিঠি দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে ইউনিসেফ।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে পাইনেট আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা বলেন, টিকা সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা, অপারেশন প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন, টিকা বিতরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অপারেশন প্ল্যান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। এ সিদ্ধান্ত তৎকালীন সরকার একা নেয়নি। ২০২২-২৩ সালের সময়ে যারা ওপি-তে ফান্ড প্রদান করত, তাদের সমন্বয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অপারেশন প্ল্যান যখন ১৯৯৭ সালে শুরু হয়, তখন এ খাতে ৭০ শতাংশ অর্থ বিদেশ থেকে আসত। পরে বিদেশি অর্থ কমে গেলে এটি পরিচালনা নিয়ে সিদ্ধান্তগত টানাপোড়েন শুরু হয়। এ টানাপোড়েনের কারণেই ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইনের টিকা ক্রয় নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। টিকা ক্রয়ের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দও রেখেছিল। কিন্তু টিকা অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে কেনা হবে, নাকি ওপেন টেন্ডারে ক্রয় করা হবে এ বিতর্কের কারণে শেষ পর্যন্ত টিকা ক্রয় করা হয়নি।

