× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৫:২৪ এএম

খেলাপি ঋণের বড় উত্থান

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০৫:২৪ এএম

খেলাপি ঋণের বড় উত্থান

তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত মার্চ শেষে দেশের তপশিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতিও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সামগ্রিক ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই লাখ পাঁচ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমলেও পরের প্রান্তিকে তা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তপশিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। আর এখন মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, সেগুলো খেলাপি হলেও নানা কৌশলে গোপন রাখা হতো। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণ সামনে এসেছে। এ কারণে গত দেড় বছর খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বেড়েছিল। তিনি বলেন, গত মার্চ শেষে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হতাশাজনক। সেজন্য আগের খেলাপি ঋণের সুদ যোগ হয়ে মোট পরিমাণ ও হার দুটোই বেড়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, গড়ে ১০ শতাংশ ঋণের সুদ বাড়লেও বছরে এক লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা সুদ বাড়ার কথা। সে হিসাবে তিন মাসে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বাড়ার কথা। তবে বেড়েছে মাত্র চার হাজার কোটি টাকা। এতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো ঋণ আদায় করছে, পরে তা বিতরণ করছে না। ফলে প্রকৃত ঋণ কমে আসছে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ডিসেম্বরের ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে মার্চে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকে এ হার ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশে, বিদেশি ব্যাংকে চার দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে চার দশমিক ৮২ শতাংশে এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশে বেড়েছে। মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ১০৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এ ঋণ তিন লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে চার লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি ৮২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণ দুই হাজার ৯৮৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার ২৬২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা হয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে তা ১৮ হাজার ৫৪৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ১৭৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মার্চ শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ৪৩ শতাংশের বেশি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকে তিন দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ৩৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। পরিমাণের দিক থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেই সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৯৬ হাজার ৫৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ এক লাখ ৪৭ হাজার ৭০৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বিদেশি ব্যাংকে দুই হাজার ৬৯৫ কোটি ৯২ লাখ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৭ হাজার ৬৪৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণ বাড়লেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতি। মার্চ ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত এক বছরে মোট ঋণ বিতরণ ৮২ হাজার ৬৭৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা চার দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে একই সময়ে খেলাপি ঋণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের এই খেলাপি ঋণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেয়, তখন দেশে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সরকারের মেয়াদে ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র দেখানো শুরু হয়। আবার আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক গ্রাহককে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ফলে খেলাপি ঋণ হু হু করে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেয়। তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসে। ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পায়। এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হল-মার্ক গ্রুপসহ কয়েকটি গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল, ইসলামী ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত কেলেঙ্কারির ঘটনায় খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

গত এপ্রিলে জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির একটি তালিকাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এগুলো হলোÑ এস. আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, এস. আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস. আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস লিমিটেড, সোনালী ট্রেডার্স, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন লিমিটেড, চেমন ইস্পাত লিমিটেড, এস. আলম ট্রেডিং কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, দেশবন্ধু সুগার মিলস লিমিটেড, পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট লিমিটেড, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, কর্ণফুলী ফুডস (প্রাইভেট) লিমিটেড, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সিএলসি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং রংধনু বিল্ডার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। আসলে তারা কী ভাবছে, ঠিক বুঝতে পারছি না। দীর্ঘদিন বলে আসছি, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের সম্পদ জব্দ করতে হবে। তাদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠাতে হবে। জেলের ভাত না খেলে তারা ঠিক হবে না। এর আগে একটা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। সে ট্রাইব্যুনালের আওতায় প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপির বিচার করতে হবে।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!