ফের সংঘাতময় হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। একই সঙ্গে আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে হাল না ছেড়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের জোর আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের সদর দপ্তরসহ অন্তত আটটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যৌথভাবে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন এখনো চলমান।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ইরানের উপকূলীয় একাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, অভিযানে নজরদারিব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, আকাশ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং সমুদ্রে মাইন পাতা সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই হামলার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরান যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরান যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার পূর্ণ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে ইরানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো সামনে আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। বাহিনীটির বক্তব্য, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ও নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইরানের এবং এ বিষয়ে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইরাক সফরকালে ঘোষণা দেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনা ইরানের হাতেই থাকবে। তিনি বলেন, জলপথের পূর্ণ সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে এবং সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী এই দায়িত্ব অন্য কোনো রাষ্ট্র পালন করতে পারবে না। তার ভাষায়, একতরফা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে এবং হরমুজ পুরোপুরি সচল হওয়ার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করবে।
এদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানি হামলার সময় রাজধানী মানামা ও মুহাররাক এলাকায় একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। হামলার সময় দেশজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো এবং নাগরিকদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়।
বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, এটি তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আগ্রাসন। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কুয়েতও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলা তাদের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির মধ্যেও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আলোচনার বিকল্প নেই এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু হলেও নতুন করে সামরিক হামলা সেই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা, অন্যদিকে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যÑ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় সংঘাতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন