ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

বৃষ্টি-জোয়ারের আঘাতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:০৩ এএম

টানা ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম নগরীতে রেকর্ড ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বশেষ ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এদিকে সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল থাকার পাশাপাশি অতিভারি বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এদিন দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শুরু হওয়া জোয়ারের কারণে ভারি বৃষ্টির পানি নদী ও সাগরে নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া মাঠপর্যায়ে উদ্ধার ও জরুরি সেবা কার্যক্রম তদারকি করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা, জনভোগান্তি :

জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম মহানগরের জনজীবন গতকাল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নগরীর নিচু এলাকার রাস্তা-গলি পানিতে ডুবে যায়, ব্যাহত হয় যান চলাচল। কমে যায় গণপরিবহনের সংখ্যা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। গতকাল সকালে মহানগরের বহদ্দারহাট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, কর্মস্থলগামী অনেকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছান। পানিতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে সড়কের মাঝপথে আটকে পড়ে, এতে যান চলাচলে বিঘœ ঘটে। এদিকে গণপরিবহন স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় বিভিন্ন বাসস্টপে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরে অনেকে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন। একই চিত্র নগরীর আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বাদামতলী, কাতালগঞ্জ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, মোহরা ও পতেঙ্গা এলাকার। অবশ্য জিইসির মোড়, দুই নম্বর গেট, ষোলশহর ও মুরাদপুরে কোনো জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আমবাগান এলাকায় ২৫৯ মিলিমিটার এবং পতেঙ্গায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় পতেঙ্গায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে অতিভারি বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি রয়েছে।

দেয়াল ধসে নিহত ১, আশ্রয়কেন্দ্রে ২৭৫ পরিবার :

চট্টগ্রাম নগরীর রহমাননগর আবাসিক এলাকায় দেয়াল ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও দুইজন। নিহত ব্যক্তির নাম সফিকুল ইসলাম (৩২)। আহতরা হলেন তার দেড় বছর বয়সী মেয়ে সাইফা এবং শাশুড়ি মর্জিনা বেগম (৫৫)। তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পাঁচলাইশ থানার এসআই শফিউল আজম জানান, ঘটনার সময় সফিকুল ইসলাম দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। হঠাৎ পাহাড়ের মাটি ধসে দেয়ালের ওপর পড়ে। এরপর দেয়ালটি ভেঙে তার শরীরে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যা।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন অতিবৃষ্টির কারণে জেলার ২৬টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব পাহাড় থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম কাজ করছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে নগরের চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, কাট্টলী ও বাকলিয়া সার্কেলের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রেখেছে জেলা প্রশাসন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো হলোÑ চান্দগাঁও সার্কেলের আল-জেরা মাদ্রাসা ও রশিদিয়া মাদ্রাসা, আগ্রাবাদ সার্কেলের ওয়াইজারডিস কমিউনিটি স্কুল এবং ইস্পাহানি কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, কাট্টলী সার্কেলের ফিরোজশাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (রেলের পাশে) ও বি এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (সেকশন-সি সংলগ্ন) এবং বাকলিয়া সার্কেলের চান্দগাঁও আবাসিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শাহ আমান সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে ২৭৫টি পরিবার এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।

আনোয়ারায় অর্ধ লাখ মানুষ পানিবন্দি : 

আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, টানা তিন দিনের ভারি বর্ষণ এবং কর্ণফুলী ও শঙ্খ নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের নিচু এলাকার অন্তত অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ফসলি জমি ও মৎস্যঘের। কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে পড়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। গতকাল সকালে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক সড়কে হাঁটুপানি জমে রয়েছে। এতে পথচারীদের চলাচলে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে ছোট যানবাহনের চলাচল। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর ও নি¤œআয়ের শ্রমজীবী মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আনোয়ারা উপজেলার সদর, চাতরী, হাইলধর, বরুমচড়া, বটতলী, পরৈকোড়া, বৈরাগ ও বারখাইন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা, চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা ও বড়উঠান ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ে অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেড এলাকা থেকে নেমে আসা ঢলে মেরিন অ্যাকাডেমি সড়কের একটি অংশ ভেঙে গেছে। ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ চলছে। অন্যদিকে, গত সোমবার রাত ১২টার পর থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে সীতাকু-ের ২৫ হাজার মানুষ :

সীতাকু- (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, টানা তিন দিন ধরে ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলায় পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে অতিভারি বৃষ্টি ও সম্ভাব্য পাহাড়ধসের সতর্কতা জারি করেছে। স্থানীয়দের মতে, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও ছোট আকারে মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতের তুলনায় প্রশাসনের মাইকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্য এখনো ঘর ছাড়েননি। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম জানান, জঙ্গল সলিমপুর এলাকার অন্তত ১০০টি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হলেও অনেক বাসিন্দা ঘর ছাড়তে অনাগ্রহী। তাদের সচেতন করার চেষ্টা চলছে।

শাহ আমানতে নামতে পারেনি ৩ ফ্লাইট :

চট্টগ্রামে অতিভারি বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক ও একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার প্রভাবে বিমানবন্দরের আগমন ও প্রস্থানে প্রায় সব ফ্লাইটের স্বাভাবিক সময়সূচিতে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়। গতকাল দুপুর ২টায় বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, আবুধাবি থেকে চট্টগ্রামগামী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ‘বিএস-৩৫০’ এবং শারজাহ থেকে আসা এয়ার অ্যারাবিয়ার ‘জি-৯৫২৬’ ফ্লাইট দুটি চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী বিমান বাংলাদেশের ‘বিজি-১২১’ ফ্লাইটটিও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামে নামতে ব্যর্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে আসে। তবে অবতরণে সমস্যা হলেও চট্টগ্রাম থেকে নির্ধারিত সব ফ্লাইট যথাসময়ে ছেড়ে গেছে বলে বিমানবন্দর সূত্র জানায়।

হাজার যাত্রী নিয়ে ফিরে গেল পর্যটক এক্সপ্রেস :

ভারি বৃষ্টি ও ঢলে রেললাইনে পানি জমে যাওয়ায় গতকাল দুপুরে প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি আটকা পড়ে। চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর সুন্নিয়া মাদ্রাসা-সংলগ্ন রেললাইন এলাকায় গতকাল দুপুর পৌনে ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এই আকস্মিক প্রতিবন্ধকতার কারণে চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ট্রেনটিকে পুনরায় ষোলশহর স্টেশনে ফিরিয়ে আনা হয়।

নগরের জানালি হাট স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নেজাম উদ্দিন এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে ষোলশহরের দিকে যাত্রা করেছিল। কিন্তু ষোলশহর মাদ্রাসা এলাকায় রেললাইনের ওপর অতিরিক্ত পানি জমে থাকায় নিরাপদ ট্রেন চলাচলের স্বার্থে ট্রেনটি সেখানে থামিয়ে দেওয়া হয়। রেলওয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়, লাইন থেকে পানি কমে গেলে রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ ট্র্যাকটি পরীক্ষা করে দেখবেন এবং সবকিছু নিরাপদ থাকলে ট্রেনটি আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা করবে।

শুক্রবার পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ :

ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে বান্দরবান জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র গতকাল থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটক ও সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত সোমবার রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ- সংক্রান্ত একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জেলায় অব্যাহত ভারি বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল, নদীপথ, দুর্গম এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটক, ট্যুর অপারেটরসহ সর্বসাধারণের ভ্রমণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে।

এদিকে প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবানের থানচি ও আলীকদম উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত সোমবার থানচির তিন্দু এলাকায় পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলেও সৌভাগ্যবশত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, দুই প্রধান সড়ক বিচ্ছিন্ন :

ভারি বর্ষণে খাগড়াছড়ি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দুই প্রধান সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গতকাল সকাল থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের মহালছড়ির একাধিক অংশ এবং দুপুর থেকে দীঘিনালা-রাঙামাটির লংগদু সড়কের মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় সবধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গত ১৮ ঘণ্টায় দীঘিনালায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় এবং চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন নিচু এলাকায় প্রবেশ করায় জেলাজুড়ে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেচনালার স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় এবং মাইনী নদীর পানি বাড়ায় মহালছড়ি ও মেরুং এলাকার লোকালয় ও সড়ক হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।

এদিকে ভারি বর্ষণের ফলে পুরো জেলায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার পরিবারের প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মানুষ চরম পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এরই মধ্যেই শহরের কুমিল্লাটিলা এলাকার সড়কে পাহাড়ের মাটি ভেঙে পড়েছে এবং গত কয়েকদিনে শালবন, খাগড়াপুর ও ঠাকুরছড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট ধসের ঘটনা ঘটেছে।

কক্সবাজারের ৩৩ ইউনিয়ন প্লাবিত :

কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এবং বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং বৃষ্টি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে গত রোববার রাতে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় আশ্রয়শিবিরে আটজন রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার শহরে একজন বাসিন্দা নিহত হন। এ ছাড়া পেকুয়া উপজেলায় মাটির ঘরধসে পড়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে ভারি বৃষ্টি ও ঢলের কারণে কক্সবাজার পৌরসভার হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা ও বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে, যা পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।

সেন্ট মার্টিন যোগাযোগবিচ্ছিন্ন :

উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নৌযান চলাচল টানা পাঁচ দিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দ্বীপটিতে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই যোগাযোগবিচ্ছিন্নের কারণে দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গত সোমবার টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তবে তাদের পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিতে জেলা প্রশাসন থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য কোস্ট গার্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

টেকনাফ ও কুতুবদিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি :

জেলায় বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দারা। উপজেলার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। হ্নীলা ইউনিয়নেই অন্তত ৪০০ ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে এবং শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টেকনাফের ইউএনও এস এম মো. অনীক চৌধুরী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।