ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

পঞ্চদশ সংশোধনী

সংসদকে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত দেওয়ার আর্জি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:০৫ এএম

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে যেসব অংশ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলো বাতিল করে বাকিগুলোয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই আর্জি জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবি জানানো হলেও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এটি আংশিক বাতিলের আবেদন করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী শিশির মনির। তিনি আদালতকে বলেন, আদালতের কাজ আইন প্রণয়ন করা নয়। তাই আদালতের আইন প্রণেতার ভূমিকা পালন করা উচিত হবে না। এই সংশোধনীর যেসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কেবল সেগুলোই বাতিল করা উচিত এবং বাকি বিষয়গুলো সিদ্ধান্তের জন্য সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া দরকার। এর আগে শুনানির শুরুতে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, অত্যন্ত অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা আদতে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এই যুক্তিতে তিনি পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীই বাতিলের দাবি জানান। তবে পুরো সংশোধনী বাতিলের কথা বললেও, তিনি সংবিধানের ৯৬ ও ১০২ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা (বহাল রাখার) আবেদন জানান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১১ সালে পাস হওয়া এই পঞ্চদশ সংশোধনীকে ভিত্তি করেই দেশে স্বৈরশাসনের বীজ বপন করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর দলীয় সরকারের অধীনে একের পর এক একপাক্ষিক ও কারচুপির নির্বাচন আয়োজন করা হয় বলে বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে টানা কয়েকদিন এ-সংক্রান্ত শুনানি হয়েছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে অতীতের মতো পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ রায় দিতে চান না উল্লেখ করে তৎকালীন সর্বোচ্চ আদালত শুনানি মুলতবি ঘোষণা করেছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন গঠিত আপিল বেঞ্চে আবার এই শুনানি শুরু হলো।

এর আগে আলাদা দুটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পথ সুগম হলেও কিছু সাংবিধানিক জটিলতা থেকে যায়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আলাদা তিনটি আপিল আবেদন করা হয়, যার ওপর বর্তমানে চূড়ান্ত শুনানি চলছে।

শুনানিতে তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ ও জাহিদ বিন আমজাদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ। এ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেছেন আদালত। শুনানি শেষে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালতের বদলে সংসদে মীমাংসা হওয়ার ওপর জোর দিয়ে শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি কী হবে? প্রস্তাবনায় কী থাকবে? অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২-তে কী থাকবে? এবং ২৫-এর ২-এ কী থাকবে? এগুলো মূলত নীতিনির্ধারণী ব্যাপার। আমরা বলেছি নীতিনির্ধারণী ব্যাপারগুলো মূলত সংসদের দায়িত্ব। একটা প্রোপার বিতর্ক করে সাংবিধানিক বিলের মাধ্যমে কোনটা গ্রহণ করবে কোনটা করবে নাÑ এই দায়-দায়িত্ব পার্লামেন্টের।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় ভাগে থাকা বিষয়গুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সেগুলো আদালতকেই বাতিলের আর্জি জানান এই আইনজীবী, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল-সংক্রান্ত কোনো আইনি জটিলতা বা সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়। শিশির মনির বলেন, আমাদের সর্বশেষ সাবমিশন হলো, আদালতকে তার মর্যাদা ঠিক রাখতে হবে, ইনডিপেন্ডেন্স ঠিক রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিতর্কে ঢোকা ঠিক হবে না। পার্লামেন্টকে ডিসাইড করতে দিতে হবে নীতি পদ্ধতিগুলো। আর আদালত ডিসাইড করবে মৌলিক স্তম্ভগুলো। এটিই আমাদের সাবমিশন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজনের করা রিট মামলার নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালে সংবিধানের ৫৫টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তিসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয় হাইকোর্টের রায়ে। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচনব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ‘গণতন্ত্র’ ও ‘জনগণের সার্বভৌমত্ব’ ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।