ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ে মৃত্যুর মিছিল

বৃষ্টি পড়লে ছাতা খোঁজে প্রশাসন

মাকসুদুল বারী টিপু
প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৬:২৫ এএম

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। গত রোববার আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার পর পাহাড়ে পাহাড়ে সতর্কতামূলক মাইকিং শুরু করেছে প্রশাসন। কিন্তু এর মধ্যেই গত তিন দিনে পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ১৮ জন এবং চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবছর এমন ঘটনা কমবেশি ঘটলেও প্রশাসনের যেন হেলদোল নেই।

চট্টগ্রামবাসী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বছরভরে থাকছে মানুষ। তা বৈধ হোক, আর অবৈধ। সেসব নিয়ে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলে ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলেই নড়েচড়ে ওঠেন তারা। শুরু হয় তোড়জোড়। চলতে থাকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান, মাইকিং, সতর্কতামূলক প্রচার এবং আশ্রয়কেন্দ্রের প্রস্তুতি। এরপর বর্ষা শেষ হলেই সব আগের মতো। থেমে যায় উদ্যোগ-প্রস্তুতি। আবারও আগের মতো চলতে থাকে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। তারা আরও বলেন, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা বছরজুড়ে কুম্ভকর্ণের ঘুমে অচেতন থাকেন, আর বর্ষা এলেই জেগে ওঠেন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের পুনর্বাসন, পাহাড় কেটে নতুন বসতি নির্মাণ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক কার্যকর পদক্ষপ থাকলে এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রায় থাকবেই না।

তিন দিনে কক্সবাজারে ১৮ ও চট্টগামে ৩ জনের মৃত্যু : প্রবল বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও বাড়ির দেয়াল ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত স্থানীয় পাঁচজন ও ১৩ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে তৎপরতা শুরু করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে তিনজনের মৃত্যু হয়।

চট্টগ্রামে ঝুঁঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যাওয়ার আহ্বান : টানা অতি ভারি বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের ঘটনার মধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড় ও এর পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে নগরীর চশমা হিল এলাকায় পাহাড় ধসে শিশুর মৃত্যুর পর ওই এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন এ আহ্বান জানিয়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ষোলোশহরের শমসের পাড়া এলাকায় রেললাইনে পানি জমে থাকার স্থান পরিদর্শনে গিয়েও একই কথা বলেছেন। বন্দর নগরীতে টানা চতুর্থ দিনের মতো অতি ভারি বর্ষণ চলছে। মঙ্গলবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টির পর নগরীর বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে। বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সে হিসাবে শেষ ৪৮ ঘণ্টায় ৫৯১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এমন ভারি বর্ষণ চলার মধ্যে বুধবার দুপুরে চশমা হিল ২ নম্বর গলির বাবু কলোনিতে পাহাড় ধসে সামিয়া নামে ১২ বছরের এক শিশুর প্রাণ যায়।

তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি ও বেসরকারি ৩৪টি পাহাড়ে বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, নগরীর ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি পাহাড়ে রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে রয়েছে আরও ৩৮৩টি পরিবার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও অবৈধ বসতির তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়। এরপর থেকে গত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ২৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ষোলোশহরের আইডব্লিউ কলোনিতে পাহাড়ধসে বাবা ও সাত মাস বয়সি মেয়ের মৃত্যু হয়। একই বছর আকবর শাহ এলাকায় আরও একজন নিহত হন। এর আগে ২০২২ সালে আকবর শাহ ও ফয়স লেক এলাকায় পাহাড়ধসে চারজন নিহত হন। এ ছাড়া ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে রাঙামাটিতে পাঁচ সেনা সদস্যসহ মারা যায় ১২০ জন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কোনো দুর্যোগ হলেই তৎপরতা দেখা যায়, বিপদ চলে গেলে ভুলে যাই। সেটা ভূমিকম্পসহ সব দুর্যোগের ক্ষেত্রেই। উন্নত দেশগুলো এগুলোর স্থায়ী সমাধান করে। পাহাড়ে লাখ লাখ মানুষ বাস করে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই নি¤œ আয়ের। বর্তমান পরিস্থিতিতে অল্প ধসেই বহু লোক মারা যাচ্ছে। যখন অনেক বেশি ধস হবে, তখন হিসাবের বাইরে লোক মারা যাবে। তাই অতিদ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল থেকে লোকজন সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। কিছু কিছু পাহাড়ি এলাকা এমন দুর্গম যে, সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে ত্রাণ নিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। সবকিছু বিবেচনায় পাহাড়ি এলাকা নিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। তাদের পুনর্বাসন করা উচিত। আমাদের দক্ষ জনবলের অভাব, উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বাসস্থান তো মৌলিক অধিকারের একটি, যা দেওয়ার দায়িত্ব ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের। আবার এটাও ঠিক, অনেকে ইচ্ছা করেই সেখানে বসবাস করে। এখানে কিছু দুর্নীতিও আছে। কিছু লোকজন জায়গাগুলো দখল করে ভাড়া দিয়ে থাকে।

বর্ষা এলেই তৎপরতা বাড়েÑ কথাটা সঠিক নয় জানিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের পাঁচটি জোনে ভাগ করা আছে। বিগত দুই বছর ধরে পাহাড় কাটার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে আছে প্রশাসন। একাধিক মামলা হয়েছে। অনেক ভূমিদস্যু, যারা পাহাড় কাটে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। জেল-জরিমানাও করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে জেলেও রয়েছে। বর্ষাকালে যেহেতু ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে; তাই এ সময়ে মাইকিংসহ তৎপরতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সচল রাখি এবং যে পরিমাণ খাদ্য লাগে, তা মজুত রাখি। আমাদের পাঁচটি কমিটির কার্যক্রম সারাবছরই চলে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাহাড়ে বসবাস গত ১০ বছরে দশগুণ বেড়ে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা আসলে চেষ্টা করি এদের অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা যায় কি না। এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের কার্যক্রম সবসময় চলমান। আমরা একাধিকবার সরকারেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি যে, তাদের পাহাড় থেকে সরিয়ে নিকটবর্তী স্থানে নেওয়া যায় কি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। সেখানে যাতে অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ না যায়, সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সতর্ক করে আসছি। তবে মামলা-মোকাদ্দমা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি না।