প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নির্বিঘেœ সম্পন্ন করতে পাঁচ দফা বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে পরীক্ষা ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এদিকে অধিকাংশ পরীক্ষার্থী আন্দোলন ছেড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ফিরলেও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠনের প্ররোচনায় একটি অংশ এখনো কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবি তুলে নতুন করে আল্টিমেটাম দিচ্ছেন।
ইতোমধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পুনঃপরীক্ষার সুযোগ, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে দুটি ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া এবং প্রশ্ন প্রণয়নে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তবে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করতে কাজ করছে একটি বিশেষ মহল। সরেজমিনে রাজধানীর আন্দোলনগুলো থেকে দেখা যায়, ছাত্র নয় এমন অনেকেই সেখানে নানা বিতর্কিত মন্তব্য ও পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এদিকে, গতকাল শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে সময় বেঁধে দিয়ে রাজধানীর শাহবাগ মোড় ছাড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই মোড় অবরোধ করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেন তারা। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করে সড়ক থেকে সরে যান তারা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী রাহাত আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাস্তা আটকে থাকায় জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে। আমরা মানুষের ভোগান্তি চাই না। তাই কর্মসূচি স্থগিত করছি। আমাদের দাবি একটাই, শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। গতকাল রাত ১০টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তা না হলে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে ‘লংমার্চ টু সচিবালয়’ কর্মসূচি পালন করারও ঘোষণা দেন।
এর আগে বেশ কিছু দাবি নিয়ে সচিবালয়ে যান শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা। গতকাল বুধবার বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছয়জন প্রতিনিধি দাবিগুলো নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। এর আগে বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে আলোচনার জন্য ছয়জন প্রতিনিধিকে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তারা শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। পরে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আলোচনা শেষে বের হয়ে যান।
এর আগে মঙ্গলবার সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটায় ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এতে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনরতরা জানান, আন্দোলনের সময় আন্দোলন, পরীক্ষার সময় পরীক্ষা। সবকিছু একসঙ্গে চলবে এবং আমাদের দাবি সরকারকে মানতে হবে।
আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। তারা অভিযোগ করেন, চলমান দুর্যোগ, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় বহু শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কেউ সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, আবার অনেককে মানসিক চাপের মধ্যেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। তবে সচিবালয়ে আলোচনার জন্য উপস্থাপিত দাবির তালিকায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে পরীক্ষা ও মূল্যায়নসংক্রান্ত ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবি : দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় যারা পুনরায় অংশ নিতে চান, তাদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই বিষয়ের পুনঃপরীক্ষা হলে আগের পরীক্ষা ও পুনঃপরীক্ষার মধ্যে যে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সেটিকেই চূড়ান্ত ফল হিসেবে গণ্য করতে হবে। প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসংগতি থাকা প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দিতে হবে। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুতির জন্য কিছু সময় দিয়ে পরে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পূর্বঘোষণা ছাড়া প্রশ্নপত্রের ধরনে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নম্বর মূল্যায়ন করতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং ‘সচেতন গার্ড’-এর নামে শিক্ষকদের অপ্রয়োজনীয় কঠোর ও বিভ্রান্তিকর আচরণ বন্ধ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে সচিবালয়ে নিরাপত্তা জোরদার : শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সচিবালয় অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচিবালয়ের প্রতিটি প্রবেশপথে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। গতকাল বুধবার সাধারণ সময়ের তুলনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। প্রতিটি গেটে অতিরিক্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান নেন। প্রবেশকারীদের পরিচয়পত্র যাচাই ও তল্লাশি জোরদার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। এর আগে রাজধানীর উত্তরা, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০ ও ইসিবি চত্বরে সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। পরে উত্তরা ও সায়েন্সল্যাব থেকে শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সচিবালয় এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়।
যারা পরীক্ষা দিতে পারেননি তাদের জন্য সুখবর, সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি : শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী চলমান এইচএসসি-সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। চট্টগ্রাম বোর্ডের স্থগিত হওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে তাদের এই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে যে দুটি প্রশ্ন ভুল ছিল, সে দুটিতে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এ সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষাকেন্দ্রে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছেন। সম্প্রতি ভারি বর্ষণ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচটি জেলা তথা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বাইরেও দেশের কিছু জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরীক্ষার্থী বৈরী আবহাওয়া ও বহুবিধ কারণে নির্ধারিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।
প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট অনিবার্য কারণে যারা চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬-এর কোনো বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তারা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ইতিমধ্যে স্থগিত হওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিন্ন পরীক্ষাপত্রে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত একই তারিখ ও সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন। যেহেতু এইচএসসি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, তাই বিশেষ বিবেচনায় এই বিশেষ সুযোগ প্রদান করা হলো। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ভুল প্রশ্নপত্র প্রণয়নে দায়ী ব্যক্তিদের ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি আবারও আশ্বস্ত করছি, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে যে ভুল হয়েছে, তার জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি : এ সময় পরীক্ষার্থীদের নিয়ে করা মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছিÑ বলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমার মন্তব্যে কেউ আহত হলে সিম্পলি আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। ফিজিকস দ্বিতীয় পত্র, যুক্তিবিদ্যা ও হিসাববিজ্ঞান পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব।’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ : টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীর বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও শেয়ারকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক ইস্যু যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট ও পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে আন্দোলনের গতিপথ প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্দোলনস্থলে উপস্থিত এক তরুণীকে একটি ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা শেখ হাসিনাকে আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও চাই।’ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়নি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ছাড়া বহিরাগতরা সেখানে ঢুকে আন্দোলনের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এমন কয়েকজনকে শনাক্ত করেছে বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন