× UCB Sticker Card
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:২৬ এএম

ভারতের স্লোগান তেলাপোকা জিন্দাবাদ নাকি জয় হিন্দ?

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:২৬ এএম

ভারতের স্লোগান  তেলাপোকা জিন্দাবাদ  নাকি জয় হিন্দ?

তেলাপোকা। যাকে দেখলেই তরুণীরা লম্ফঝম্প শুরু করে দেয়, গৃহবধূর হাতে ঝাঁটা, জুতো, স্প্রে কিংবা খবরের কাগজ উঠে আসে। যাকে মানুষ সভ্যতার সবচেয়ে অবাঞ্ছিত অতিথি মনে করে। অথচ এই তেলাপোকাই এখন ভারতের তরুণসমাজের নতুন প্রতীক। রাজনীতির অভিধানে এমন দিন আসবে, কে জানত? আসলে ভারতের রাজনীতিতে সবই সম্ভব। সেখানে কখনো গরু ভোটের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, কখনো চা হয়ে যায় জাতীয়তাবাদের প্রতীক, কখনো গ্যাসের সিলিন্ডার হয়ে ওঠে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির নায়ক। কিন্তু এবার যে প্রাণীটি ভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে আত্মপ্রকাশ করে কামড় দিয়েছে মোদির শরীরেÑ তার নাম তেলাপোকা। 

একসময় ভারতীয় রাজনীতিতে স্লোগান ছিল, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ, জয় হিন্দ’। এখন মনে হচ্ছে, সময়ের দাবি মেনে নতুন স্লোগান হতে পারে, ‘তেলাপোকা জিন্দাবাদ!’ কারণ তেলাপোকা এমন এক প্রাণী, যে সহজে মরে না। রান্নাঘরের অন্ধকার কোণ থেকে সে আবার বেরিয়ে আসবেই। সম্প্রতি যোগ হয়েছে ক্ষুদ্রাকারের আরেক প্রজাতির তেলাপোকা। যাকে অনেকে বলে থাকেন চাইনিজ তেলাপোকা। মোদির গদিতে যে ককরোচ বা তেলাপোকা কামড় দিয়েছে সেটা চাইনিজ কি না, তা ভাবিয়ে তুলেছে অনেককে।

ভারতীয় গণতন্ত্রে তরুণদের অবস্থাও যেন আজ সেই রকম। তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। ফরম পূরণ করে। ফি জমা দেয়। বছরের পর বছর পড়ে। বয়সসীমা এগিয়ে আসে। চাকরির আশায় বুক বাঁধে। তারপর একদিন খবর আসেÑ প্রশ্নপত্র ফাঁস! পরীক্ষা বাতিল। আবার পরীক্ষা। আবার প্রস্তুতি। আবার ফি। আবার অপেক্ষা। তারপর আবার কোনো না কোনো গোলমাল। একসময় তরুণটি বুঝতে পারে, সে আর পরীক্ষার্থী নয়; সে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ‘প্রতীক্ষমাণ নাগরিক’। এমন তরুণকে যদি কেউ তেলাপোকা বলে, সে অপমানিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের নতুন প্রজন্ম বোধহয় একটু অন্য ধাতুর। তারা অপমানকে উল্টে অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। ‘রাজাকার’ বলে গালি দিয়ে যেমন থামানো সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের দামাল ছেলে-মেয়েদের। এমনও হতে পারে, সেই সূত্র ধরেই জন্ম নিয়েছে কল্পিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’- সিজেপি। দলটির প্রতীক তেলাপোকা। অনেকে আবার একধাপ বাড়িয়ে বলছে, শেখ হাসিনা তো ভারতেই মোদির আশ্রয়ে। হাসিনার কাছ থেকেও তিনি কিছু শিক্ষা নিয়ে থাকতে পারেন। যে ভুলটা হাসিনা করেছেন, সেই ভুলটা মোদি করতে চাননি। মোদি আন্দোলনের মাত্রা বুঝে দুই দফা দাবি মেনে নিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানও পদত্যাগ করেছেন।

সিজেপি প্রসঙ্গে আসি। সিজেপির নির্বাচনি ইশতেহারও নাকি বেশ চমৎকার। সেখানে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে পরীক্ষার্থীকে আর পরীক্ষা দিতে হবে না। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে পরীক্ষার্থীর সামনে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। যে কর্মকর্তা বছরের পর বছর তদন্তের নামে ফাইল ঘোরাবেন, তাকে পুরস্কার হিসেবে আরও একটি ফাইল দেওয়া হবে। আর যে বেকার তরুণ পাঁচ বছর ধরে চাকরির প্রস্তুতি নিয়েও চাকরি পাননি, তাকে ‘অভিজ্ঞ বেকার’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ইশতেহারে নাকি এটাও আছে, দেশের প্রতিটি সরকারি অফিসে একটি করে তেলাপোকা রাখা হবে। কারণ আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে অন্ধকার কোণ, সবচেয়ে গোপন ড্রয়ার এবং সবচেয়ে পুরোনো ফাইলের খবর তেলাপোকার চেয়ে ভালো আর কে জানে!

দলের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি অবশ্য একটাইÑ প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা। কারণ সিজেপির নেতারা বুঝেছেন, ভারতের তরুণরা এখন আর বড় বড় রাজনৈতিক ভাষণে খুব বেশি উত্তেজিত হয় না। তারা জানতে চায়, পরীক্ষাটা হবে তো? প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না তো? ফল বেরোবে তো? চাকরি হবে তো? একজন তরুণের কাছে ‘অমৃতকাল’ তখনই অমৃত, যখন সে নিয়োগপত্র হাতে পায়।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে পদত্যাগের দাবি এবং শিক্ষা-সংক্রান্ত ক্ষোভের রাজনৈতিক অভিঘাত তাই নিছক একটি মন্ত্রীর পদত্যাগের গল্প নয়Ñ এটি সেই বৃহত্তর অস্বস্তির প্রতীক, যেখানে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষুব্ধ তরুণ রাজপথে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে তার নিজের রিপোর্ট কার্ড দেখাতে শুরু করে। দিল্লির সিংহাসনে বসে থাকা যেকোনো সরকারের জন্য এই দৃশ্য সুখকর নয়। কারণ বিরোধী দলকে সামলানো যায়। তাদের সভা হয়, মিছিল হয়, পাল্টা মিছিল হয়, টেলিভিশনে বিতর্ক হয়, তারপর রাত নামে। কিন্তু ক্ষুব্ধ তরুণকে সামলানো কঠিন।

আন্দোলনে নরেন্দ্র মোদির পরাজয় হয়েছেÑ এ কথা বললে হয়তো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অতিরঞ্জিত হবে। ভারতের রাজনীতিতে মোদির শক্তি, জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনি দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, সেটি আলাদা বিতর্ক। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কারÑ কোনো সরকারের জন্যই তরুণসমাজের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ স্বস্তির খবর নয়। রাজনীতিতে সিংহাসন বড় জিনিস। কিন্তু সিংহাসনের নিচে জমে থাকা ধুলোও কখনো কখনো বিপ্লবের কারণ হয়। আর তেলাপোকা সেই ধুলোতেই বাস করে। এই জায়গাতেই কলকাতার চায়ের কাপটি একটু বেশি গরম হয়ে ওঠে।

দিল্লির মসনদে যখন শিক্ষা, পরীক্ষা, প্রশ্নফাঁস আর তরুণদের ক্ষোভ নিয়ে রাজনৈতিক অস্বস্তি, তখন বাংলার রাজনৈতিক বারান্দা থেকে দৃশ্যটি নিশ্চয়ই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো দীর্ঘদিনের কেন্দ্রবিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের কাছে এই ঘটনাপ্রবাহ নিছক দিল্লির প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির বাতাসের দিক বদলানোর সম্ভাব্য ইঙ্গিতও হতে পারে। মমতার রাজনীতির নিজস্ব অভিধানে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই নতুন কিছু নয়। দিল্লির সঙ্গে কলকাতার রাজনৈতিক টানাপোড়েনও বহু পুরোনো। ফলে দিল্লির ক্ষমতার দেয়ালে যদি সামান্য আঁচড় পড়ে, কলকাতার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা সেখানে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা খুঁজবেন, এটাই স্বাভাবিক।

তবে তেলাপোকার এই উত্থান মমতার জন্যও নিছক আনন্দের বিষয় নয়। কারণ তেলাপোকা কোনো দলের একার সম্পত্তি নয়। সে বিরোধীও নয়, শাসকও নয়। সে সর্বদলীয়। আজ দিল্লির রান্নাঘরে, কাল কলকাতার বারান্দায়, যেখানে অন্ধকার কোণ, সেখানেই তার সম্ভাব্য ঠিকানা। এটাই তেলাপোকার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। সে কোনো পতাকার নিচে দাঁড়ায় না। কোনো দলীয় কার্যালয়ে যায় না। কোনো নেতার পোস্টার ছাপায় না। দিল্লি যদি মনে করে, একটি মন্ত্রী বদলালেই সমস্যার সমাধান, তবে ভুল হতে পারে। কারণ মন্ত্রী বদলানো সহজ, কিন্তু মানুষের মনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন বদলানো কঠিন। আজ ধর্মেন্দ্র প্রধান। কাল অন্য কেউ। কিন্তু প্রশ্নটা থাকবেÑ পরীক্ষা কি নিরাপদ? চাকরি কি স্বচ্ছ? যোগ্যতা কি সত্যিই মূল্য পায়? নাকি ভবিষ্যৎও এখন প্রশ্নপত্রের মতো আগে থেকেই কোথাও ফাঁস হয়ে যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হয়তো বাস্তব দল হবে না, কিন্তু তার প্রতীকটি বেঁচে থাকবে। হয়তো আগামী দিনে ভারতের কোনো নির্বাচনি পোস্টারে সত্যিই তেলাপোকা থাকবে না। কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষার হলে, প্রতিটি চাকরিপ্রার্থীর দীর্ঘশ্বাসে, প্রতিটি বাতিল পরীক্ষার ঘোষণায় এবং প্রতিটি বেকার তরুণের চোখে সেই তেলাপোকার ছায়া দেখা যাবে।

ভারতের তরুণসমাজও সম্ভবত এখন সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। তারা আর শুধু চাকরি চায় না। তারা জবাবদিহি চায়। শুধু পরীক্ষা চায় না। তারা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা চায়। শুধু সরকার চায় না। তারা এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে ভবিষ্যৎ কোনো প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ফাঁস হয়ে যাবে না। তাই এই মুহূর্তে মোদির পরাজয় হয়েছে কি না, তার উত্তর ইতিহাস দেবে। তেলাপোকার জয় হয়েছে কি না, তার উত্তর হয়তো পরবর্তী নির্বাচন বলে দেবে। কিন্তু একটা জিনিস ইতিমধ্যেই প্রমাণিতÑ ভারতের রাজনীতিতে তেলাপোকা এখন আর শুধু রান্নাঘরের প্রাণী নয়; সে একটি রাজনৈতিক উপমা। তার সবচেয়ে বড় গুণ, সে টিকে থাকে। দিল্লির মসনদে আজ যে-ই বসুন, কাল যে-ই মন্ত্রী হোন, এই তেলাপোকাকে আর সহজে তাড়ানো যাবে না। মোদি হারলেন বা জিতলেন কি না, তা পরে দেখা যাবে। কিন্তু তেলাপোকা যে জেগে উঠেছেÑ এটাই আপাতত খবর। সব মিলিয়ে একটা কথা জোরালোভাবেই বলা যেতে পারে, ভারতের রাজনীতিতে এখন তেলাপোকা দর্শনের জয়জয়কার।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!