যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর রিংয়ের দাম আকাশছোঁয়া। তা সাধারণের নাগালের বাইরে। ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। কেউ কেউ আবার রিংয়ের বাড়তি দাম পরিশোধ করতে গিয়ে বাড়াচ্ছেন ঋণের বোঝা। এমনকি বিক্রি করতে হচ্ছে ভিটা-মাটিও।
এমনই এক রোগীর স্বজন আফিজুর রহমান বলেন, রাজধানীর একটি বেসরকারি গত মাসের শেষে আমার আম্মাকে ভর্তি করাই হার্টের সমস্যা নিয়ে। সেখানে এনজিওগ্রাম করালে ৩টি ব্লক ধরা পড়ে। তখন চিকিৎসক আমাকে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির স্টেন্ট কেনার কথা বলেন। সব মিলিয়ে ৪ লাখের ওপর দাঁড়ায়। স্টেন্ট লাগাতেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বাকি খরচ কীভাবে চালাবÑ এ চিন্তা থেকে আম্মাকে নিয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাই। সেখানে সব মিলিয়ে মাত্র দেড় লাখ টাকার স্টেন্ট লাগানো হয়। আমার আম্মা এখন সুস্থ আছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা মেহেদী হাসানের। তিনি জানান, রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাকের পর আমাকে ভর্তি করা হয়। ডাক্তার আমার পরিবারকে জানান দ্রুত রিং পরাতে হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি বিদেশি রিংয়ের দাম চায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অথচ সরকার নির্ধারিত দাম তখন ছিল ৩০ থেকে ৪০ হাজার। নিরুপায় হয়ে আমার পরিবার ঋণ করে চিকিৎসা করায়।
একই অভিযোগ করেন রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা রওশন আরা বেগম। তিনি জানান, আমাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বলা হয়, হার্টে অন্তত দুইটি রিং লাগবে। আমার পরিবার রাজি না হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হুমকি দেয় রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। পরে দুটি রিং জোর করে বসানো হয়।
রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা আবদুল কাদের মোল্লা জানান, আমার এক আত্মীয়কে জরুরি ভিত্তিতে হার্টের রিং লাগাতে বলা হয়। এক হাসপাতালে রিংয়ের দাম বলে দেড় লাখ, আরেক হাসপাতালে ৯০ হাজার, সরকারি হাসপাতালে ৪০ হাজার।
হার্টের স্টেন্ট নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং অনর্থক অস্ত্রোপচার মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে মনে করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। রিংয়ের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের বাঁচার অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে বলেও মনে করে সংস্থাটি।
সংস্থাটি বলছে, গত বছর যখন হার্টের রিংয়ের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলো, তখন নির্ধারিত দামে হার্টের রিং সরবরাহ না করার হুমকি দিয়েছিল আমদানিকারকরা। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোস্টন সায়েন্টিফিক লিমিটেডের প্রোমুস প্রিমিয়ার বা হার্টে বসানোর রিং ভারতে বিক্রি হয় ১২ হাজার রুপিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশে একই রিং কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধ প্রশাসন থেকে রিংয়ের দাম পুনর্নির্ধারণ করে দেওয়ায় চলতি বছরও আমদানিকারকরা যে হুমকি দেবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং কিছু চিকিৎসক মিলে দেশে হার্টের রিংয়ের অনৈতিক বাণিজ্য করছে। হার্টের রিংয়ের বাণিজ্য নিয়ে দেশে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেট দেশের রিংয়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি করছে। অন্যদিকে, কিছু অসাধু চিকিৎসক অনৈতিকভাবে অযথা রোগীদের বর্ধিত মূল্যে অস্ত্রোপচার করছে, যা রোগীদের জীবন নিয়ে খেলার শামিল।
মানবাধিকার কমিশন বলছে, সমন্বিতভাবে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন। হার্টের রোগীদের জন্য রিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে হার্টের রিং-সংক্রান্ত দামের বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। সম্প্রতি সরকার হার্টের রিংয়ের দাম কমিয়েছে। যে কারণে এ আলোচনা নতুন করে স্থান পেয়েছে। এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের বাঁচার অধিকার ক্ষুণœ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হার্টের রিং কম খরচে সরবরাহ করা অত্যাবশ্যকীয়। কমিশন মনে করে জনস্বার্থ বিবেচনা, সরকারের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত ও ব্যাবসায়িক নৈতিকতার সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন।
যেসব আমদানিকারক সিন্ডিকেট করে অনৈতিক বাণিজ্য করছেন এবং যেসব অসাধু চিকিৎসক অর্থের লোভে অযথা রোগীদের অস্ত্রোপচার করে হয়রানি করছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন