সামনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তথ্যের চাপ, মতামতের সংঘাত এবং সর্বোপরি বিভ্রান্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে নানা ছবি, ভিডিও ও অডিও ক্লিপ, যার অনেকগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নতুন এক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এআই এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে খুব সহজেই বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করা সম্ভব। এ বিষয়ে দৈনিক রূপালীর সঙ্গে কথা বলেছেন ‘ডায়ানা হোস্টিং’ কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং জনপ্রিয় এআই কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিন রাফান। তিনি বলেন, ‘ভোটে সময় এআই দিয়ে মহাপ্রতারণা করা সম্ভব। এমনও হতে পারে, জাল ভোটের এআই-তৈরি ছবি বা ভিডিও দেখে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে, উত্তেজিত হবে কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত নেবে।’ তার মতে, ‘প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি দায়িত্বশীল ব্যবহার না হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।’
এআই-নির্মিত বিভ্রান্তির ঝুঁকি
আগে ভুয়া খবর বলতে বোঝাতো ভুল তথ্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব। এখন সেই গুজব আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিওতে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রার্থীর মুখ বসিয়ে এমন বক্তব্য দেখানো যায়, যা তিনি কখনো বলেননি। আবার কারো কণ্ঠ নকল করে অডিও ক্লিপ বানিয়ে তা ছড়িয়ে দেওয়া যায় মুহূর্তের মধ্যে। এসব কনটেন্ট এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় আবেগ, দলীয় সমর্থন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বেশি থাকে। এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হলে সহিংসতা, ভুল ধারণা এবং ভোটারদের আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে। তাই এআই-নির্মিত কনটেন্ট চিহ্নিত করা এখন শুধু প্রযুক্তিবিদদের দায়িত্ব নয়, সাধারণ নাগরিকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
যেভাবে চিনবেন এআই-তৈরি ছবি বা ভিডিও
রবিন রাফান জানান, কিছু প্র্যাক্টিক্যাল কৌশল অনুসরণ করলে এআই-নির্মিত ছবি বা ভিডিও চিহ্নিত করা অনেকটাই সহজ হয়।
সোর্স চেক করুন
প্রথমেই দেখুন, কনটেন্টটি কোথা থেকে এসেছে। এটি কি কোনো অফিসিয়াল পেজ, পরিচিত গণমাধ্যম বা বিশ্বস্ত সংবাদ সংস্থা প্রকাশ করেছে? নাকি হঠাৎ তৈরি হওয়া অচেনা কোনো পেজ বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হচ্ছে? উৎসই অনেক সময় সত্যতা যাচাইয়ের প্রথম ধাপ।
রিভার্স ইমেজ বা ভিডিও সার্চ
গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ বা অন্য টুল ব্যবহার করে দেখুন ছবিটি আগেও কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল কিনা। অনেক সময় পুরোনো ছবি নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। ভিডিওর ক্ষেত্রেও একই কৌশল কাজে লাগে।
ফ্রেম-বাই-ফ্রেম পর্যবেক্ষণ
ভিডিও ভালো করে দেখলে অনেক সময় সূক্ষ্ম গড়বড় ধরা পড়ে। যেমনÑ মুখের অস্বাভাবিক ব্লিংক, দাঁত বা কানের আকৃতিতে অদ্ভুততা, হাত বা আঙুলের অস্বাভাবিক নড়াচড়া, কিংবা লেখার বিকৃতি। এসবই ডিপফেকের সাধারণ লক্ষণ হতে পারে।
অডিও ক্লু খেয়াল করুন
এআই-তৈরি অডিওতে অনেক সময় লিপ-সিঙ্ক ঠিক থাকে না, কণ্ঠে রোবটিক বা যান্ত্রিক টোন শোনা যায়, অথবা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ অস্বাভাবিক লাগে। বক্তার স্বাভাবিক কণ্ঠের সঙ্গে মিল না থাকলে সন্দেহ করা উচিত।
মেটাডেটা ও আপলোড প্যাটার্ন দেখুন
হঠাৎ নতুন কোনো পেজ বা বট অ্যাকাউন্ট থেকে একই কনটেন্ট একসঙ্গে অনেক জায়গায় ছড়ানো হলে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে। নিয়মিত, পরিচিত অ্যাকাউন্টের তুলনায় এ ধরনের অ্যাকাউন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা কম।
ফ্যাক্ট-চেক নেটওয়ার্কের সাহায্য নিন
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ও নিউজরুম এখন এআই-নির্মিত ভুয়া কনটেন্ট যাচাই করছে। কোনো সন্দেহজনক খবর দেখলে সেসব প্রতিষ্ঠানের যাচাইকৃত প্রতিবেদন খুঁজে দেখা যেতে পারে।
রবিন রাফানের মতে, ‘এআই নিজে ভালো বা খারাপ নয়। এটি ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু ভোটের মতো সংবেদনশীল সময়ে আমাদের সবাইকে একটু বেশি সতর্ক হতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, শেয়ার করার আগে যাচাই করা, আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট রিপোর্ট করা; এই তিনটি অভ্যাসই অনেক বড় ক্ষতি ঠেকাতে পারে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সঠিক তথ্যের ওপর নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত। এআইয়ের যুগে সেই ভিত্তি রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্র বা প্রযুক্তি কোম্পানির নয়, আমাদের সবার। আসন্ন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই করাও নাগরিক দায়িত্বের অংশ হয়ে উঠেছে। সতর্ক থাকলেই বিভ্রান্তির এই ঢেউ মোকাবিলা করা সম্ভব।

