প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্মার্টফোন হাতে নেওয়া থেকে শুরু করে ই-মেইল পাঠানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, অনলাইন কেনাকাটা, ভিডিও কনফারেন্স কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন সেবা গ্রহণÑ সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে একটি মৌলিক প্রযুক্তি, যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ভিন্টন (ভিন্ট) সার্ফ। আধুনিক ইন্টারনেটের অন্যতম স্থপতি হিসেবে পরিচিত এই কিংবদন্তি কম্পিউটার বিজ্ঞানী আগামী সপ্তাহে গুগলের চিফ ইন্টারনেট ইভানজেলিস্ট পদ থেকে অবসর নিচ্ছেন। ৮৩ বছর বয়সে তার এই বিদায় শুধু একটি চাকরির সমাপ্তি নয়, বরং প্রযুক্তি ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপেন ফ্রন্টিয়ার সম্মেলনে ভিন্ট সার্ফের অবসরের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির খ্যাতিমান কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডেভ প্যাটারসন উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে জানান, গুগলে দুই দশকেরও বেশি সময় কাজ করার পর সার্ফ অবসর নিচ্ছেন। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উপস্থিত গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদেরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানান সেই মানুষটিকে, যার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়েই আজকের বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে।
ভিন্ট সার্ফের নাম উচ্চারিত হলেই চলে আসে রবার্ট কানের নামও। ১৯৭০-এর দশকে এই দুই বিজ্ঞানী মিলে তৈরি করেন টিসিপি/আইপি নামের নেটওয়ার্কিং প্রোটোকল, যা বিশ্বের বিভিন্ন কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে একই নিয়মে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ দেয়। এই প্রযুক্তিই পরবর্তীকালে আধুনিক ইন্টারনেটের ভিত্তি হয়ে ওঠে। আজ মানুষ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তেই তথ্য পাঠাতে পারে, ভিডিও দেখতে পারে, ক্লাউডে তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে কিংবা অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেÑ এসবের কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রোটোকল। এ কারণেই ভিন্ট সার্ফকে বিশ্বের প্রযুক্তি অঙ্গনে ‘ইন্টারনেটের জনক’ হিসেবে সম্মান জানানো হয়।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন টুরিং অ্যাওয়ার্ড, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম এবং অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মানসূচক ডক্টরেট। প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহারের যে দর্শন তিনি তুলে ধরেছেন, সেটিও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
২০০৫ সালে গুগলে যোগ দিয়ে সার্ফ নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চিফ ইন্টারনেট ইভানজেলিস্ট হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত, নিরাপদ এবং সবার জন্য সহজলভ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করেছেন।
প্রযুক্তি নীতিমালা, আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন।
অবসরের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত আলোচনায়ও তার দৃষ্টি ছিল ভবিষ্যতের প্রযুক্তির দিকে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের প্রেক্ষাপটে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই এজেন্ট যখন একে অপরের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে, তখন তাদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নতুন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মান বা প্রোটোকল অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
তার ভাষায়, বিভিন্ন উৎসের এআই এজেন্ট যদি একই পরিবেশে নিরাপদ ও নির্ভুলভাবে কাজ করতে চায়, তাহলে তাদের মধ্যে ইন্টারঅপারেবিলিটি, কম্পোজেবিলিটি এবং স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন নিশ্চিত করতেই হবে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভবিষ্যতের এআই এজেন্টগুলো হয়তো মানুষের মতো স্বাভাবিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারবে। তবে ভিন্ট সার্ফ এই ধারণা নিয়ে সতর্ক। তার মতে, মানুষের ভাষায় সবসময় কিছু না কিছু অস্পষ্টতা থাকে। একটি বাক্য বা নির্দেশ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কেবল প্রাকৃতিক ভাষার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ হবে না। বরং নির্ভুল ও দ্ব্যর্থহীন যোগাযোগের জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্রোটোকল বা মানসম্মত ভাষার প্রয়োজন হবে।
এই বিষয়টি বোঝাতে তিনি ‘টেলিফোন গেম’-এর উদাহরণ দেন। একজনের কানে কানে বলা একটি বাক্য কয়েকজনের মাধ্যমে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ ধারণ করে। তার মতে, যদি অসংখ্য এআই এজেন্ট একইভাবে শুধু প্রাকৃতিক ভাষায় তথ্য আদান-প্রদান করে, তাহলে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। ভবিষ্যতের এআই অর্থনীতিকে কার্যকর রাখতে তাই নির্ভুল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মেলনের শেষ দিকে প্রযুক্তির পাশাপাশি উঠে আসে সার্ফের ব্যক্তিত্বের গল্পও। ডেভ প্যাটারসন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই ভিন্ট সার্ফ ছিলেন প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে পরিপাটি পোশাক পরা মানুষদের একজন। হাসতে হাসতেই সার্ফ বলেন, অন্যদের মতো লম্বা চুল রাখার পরিবর্তে শার্ট, টাই ও ভেস্ট পরেই তিনি নিজেকে আলাদা করে তুলতে চেয়েছিলেন।
ভিন্ট সার্ফের অবসর একটি যুগের সমাপ্তি হলেও তার চিন্তা ও অবদান আগামী দিনের প্রযুক্তি বিকাশে পথ দেখাতে থাকবে। যেমন টিসিপি/আইপি বিশ্বকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল নেটওয়ার্কে যুক্ত করেছিল, তেমনি তিনি বিশ্বাস করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগামী যুগেও উন্মুক্ত, নিরাপদ ও মানসম্মত যোগাযোগব্যবস্থাই হবে বৈশ্বিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। তাই তার বিদায় প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য আবেগের হলেও, তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ভবিষ্যতের উদ্ভাবকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন