দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বর্তমানে সহজেই ব্যাংকে টাকা জমা রাখা যাচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে সুবিধাভোগীদের কাছে। আবার ব্যাংকের শর্তাবলি পূরণের মাধ্যমে ঋণও পাচ্ছেন কেউ কেউ। হাতের নাগালে এসব ব্যাংকিং সুবিধা পেতে গ্রাহককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে না। একই সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকে পাওয়া যাচ্ছে ডেবিট কার্ডের সুবিধাও। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পাল্টাতে ভূমিকা রাখছে। পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বিশেষভাবে মনোযোগ দিচ্ছে। তাতে যেমন এজেন্ট, আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অধিকসংখ্যক মানুষ আর্থিক সেবার আওতায় আসছে; তেমনি বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ১২ বছর আগে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। গ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই এ সেবা বড় হচ্ছে। এজেন্ট ব্যবস্থায় এখন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৭২। এর মধ্যে ২ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৪ হিসাব গ্রামীণ এলাকায়। আর সারা দেশে যে ২০ হাজার ৫০০ এজেন্ট আউটলেট খোলা হয়েছে, এর ৯২ শতাংশই গ্রামে। মোট আমানতের ৮০ শতাংশ এসেছে গ্রাম থেকে। ঋণেরও বেশির ভাগ বিতরণ হয়েছে সেখানে। সবচেয়ে আশার বিষয় হলো, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মোট অ্যাকাউন্টের ৫২ শতাংশের বেশি নারীর।
ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এর পর ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা জারির কিছুদিনের মধ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। যে কারণে দিনটি এখন এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ঢাকার পাশর্^বর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার জৈনসার ইউনিয়নে প্রথম এজেন্ট আউটলেট খোলা হয়।
এক যুগ আগে বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু হলেও ১৯৯৯ সালে বিশে^ প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে ব্রাজিল। এ ছাড়া কলম্বিয়া, পেরু, মালয়েশিয়া, কেনিয়া, মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনাসহ কয়েকটি দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু আছে। এসব দেশেও কম খরচের এ সেবার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো।
যে কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং
শাখা খুলে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া অনেক ব্যয়বহুল। বিশেষ করে লোকবল, জায়গা ভাড়া, সাজসজ্জা, নিরাপত্তাসহ সব মিলিয়ে শাখার পেছনে যে পরিচালন ব্যয় হয়, তা পুষিয়ে মুনাফা করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। যে কারণে ব্যাংকগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা খুলতে আগ্রহ দেখায় না। এ রকম বাস্তবতা মাথায় রেখে প্রত্যন্ত গ্রাম, চর, দ্বীপসহ সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মানুষকে সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং বা প্রতিনিধি ব্যাংকিংয়ের ধারণা এসেছে। ব্যাংকের পক্ষে একজন উদ্যোক্তা এজেন্ট হিসেবে নির্ধারিত কমিশনের বিনিময়ে সেবা দিয়ে থাকেন। প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায় এখান থেকে। ব্যাংকের নির্ধারিত একটি শাখার তত্ত্বাবধানে প্রতিটি এজেন্ট আউটলেট পরিচালিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত ব্যাংকের শাখা নেইÑ এ রকম এলাকায় এজেন্ট অনুমোদন দিয়ে থাকে। যে কারণে গ্রামকে কেন্দ্র করেই এজেন্ট ব্যাংকিং বেড়ে উঠেছে।
দ্রুত বাড়ছে সেবা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর পর্যন্ত ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে। সারা দেশের ১৫ হাজার ৩৪০ জন এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ২০ হাজার ৫১৩ এজেন্ট আউটলেট। এর মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৩টি গ্রামে। গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশে যেখানে ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১১ হাজার ৪০১টি। এর মানে গত এক যুগে ব্যাংক শাখার প্রায় দ্বিগুণ এজেন্ট আউটলেট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মোট এজেন্ট আউটলেটের মধ্যে প্রথম শুরু করা ব্যাংক এশিয়ার আউটলেট এখন পাঁচ হাজার ৩৫টি। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আউটলেট ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। ব্যাংকটির মোট আউটলেটের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৬২৮টি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংকের আউটলেটের সংখ্যা দুই হাজার ৭৮৮টি। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের আউটলেটের সংখ্যা এক হাজার ১১৮টি। বিভাগভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি এজেন্ট রয়েছে ঢাকা বিভাগে। ঢাকার তিন হাজার ৯৪৭ এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে পাঁচ হাজার ১৮৭টি আউটলেট। আর সর্বনি¤œ ময়মনসিংহ বিভাগে ৮১৮ এজেন্ট পরিচালনা করছেন এক হাজার ১৬৬টি আউটলেট। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রামের তিন হাজার ৬৪৬ এজেন্ট চার হাজার ১৭১টি আউটলেট পরিচালনা করছেন। পর্যায়ক্রমে খুলনার এক হাজার ৮৭৫ এজেন্ট এবং দুই হাজার ৪৯৫টি আউটলেট, রাজশাহীর এক হাজার ৮০৯ এজেন্ট এবং দুই হাজার ৪৬১টি আউটলেট, বরিশালের এক হাজার ৩২ এজেন্ট এবং এক হাজার ৩৫৮টি আউটলেট, রংপুরের এক হাজার ৩৪৩ এজেন্ট ও দুই হাজার ২১টি আউটলেট এবং সিলেটে ৮৭০ এজেন্ট ও এক হাজার ১৫৪টি আউটলেট পরিচালনা করছেন।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এখন গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৭২। এর মধ্যে দুই কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৪ বা ৯২ শতাংই গ্রামীণ এলাকায়। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অর্ধেকের বেশি অ্যাকাউন্ট নারীদের। গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এক কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৩৫ অ্যাকাউন্ট নারীর। পুরুষের যেখানে এক কোটি ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬১ অ্যাকাউন্ট। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৪৭ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার আমানত স্থিতি রয়েছে। এই আমানতের মধ্যে ৩৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা গ্রামে। মোট আমানতের যা ৮৩ শতাংশ। গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬৬৯ কোটি টাকা বা ৬৪ দশমিক ৩২ শতাংশই পেয়েছে গ্রামের মানুষ। গত বছরের নভেম্বর মাসে এ ব্যবস্থায় দুই হাজার ৭৪১ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বিতরণ হয়েছে। ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৯২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের রেকর্ড ভঙ্গ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে বিপ্লব বয়ে এনেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখন প্রবাসী আয় বিতরণের অন্যতম চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। এটি প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নে যুক্ত করেছে।’

