ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কে হচ্ছেন বিএনপির নতুন মহাসচিব

মেহেদী হাসান খাজা
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন—দলের পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন। প্রায় এক দশক পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি, সরকার গঠনের পর দলীয় কাঠামোতে দৃশ্যমান শৈথিল্য এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বের ঘাটতি—সবকিছু মিলিয়ে এই পদটি এখন কেবল সাংগঠনিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কৌশলগত হয়ে উঠেছে।

দলীয় সূত্র মতে, সরকার গঠনের পর বিএনপিতে এক ধরনের নেতৃত্বের ‘শূন্যতা’ বিরাজ করছে; তাই নেতৃত্ব পরিবর্তন সময়ের দাবি। দলের সাংগঠনিক কাজ গতিশীল করতে দীর্ঘ এক দশক পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করতে যাচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এ নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটি।

দলীয় একটি বিশেষ সূত্র মতে, শুধু বিএনপির বড় বড় পদে পরিবর্তন হবে—বিষয়টি এমন নয়; অধিকাংশ নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসছে। বিএনপির গুলশান ও নয়াপল্টন অফিসের সূত্র মতে, মহাসচিব পদে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি দুর্দিনে সব সময় দলকে আঁকড়ে রেখেছেন। যার কারণে দলের মধ্যে ও বাইরে তার জনপ্রিয়তা শীর্ষে রয়েছে বলে জানা গেছে। জোরালো আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য, বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও।

এ ছাড়া বিভিন্ন মহলে যার নাম শোনা যাচ্ছে, তিনি স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য, বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া মহাসচিব পদে দলের নেতাকর্মীদের কাছে যোগ্যতায় এগিয়ে রয়েছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাবেক আহ্বায়ক হাবিব উন নবী খান সোহেল। অন্যদিকে, বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমান, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের নামও আলোচিত হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে দলীয় কার্যক্রমে তার সরাসরি সময় দেওয়া সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দলীয় ভেতরেই মহাসচিব পরিবর্তনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অবস্থান করায় দলীয় কার্যক্রমে এক ধরনের ‘শূন্যতা’ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে সক্রিয় রাখা দরকার। অতীতে বিরোধী দলে থাকাকালে আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল প্রধান শক্তি, কিন্তু এখন প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই দলীয় হাইকমান্ড এমন একজন মহাসচিব খুঁজছে, যিনি হবেন পুরোপুরি সময় দেওয়া একজন সংগঠক, মাঠমুখী নেতা এবং একই সঙ্গে নীতিগতভাবে দৃঢ়।

এই প্রেক্ষাপটে একাধিক নেতার নাম ঘুরেফিরে আসছে, যাদের নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি কার্যত দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম, সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ঘোষণা—সবখানেই তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও তাকে দলের মুখপাত্র হিসেবে সামনে থাকতে দেখা গেছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ‘ফুলটাইম অর্গানাইজার’ হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি, যা তাকে এই দৌড়ে এগিয়ে রাখছে।

এসব বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানিয়েছেন, বিষয়টি দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার। দলের হাইকমান্ড চাইলে যাকে ইচ্ছা তাকে মহাসচিব পদে বসাতে পারেন। হাইকমান্ড অবশ্যই যোগ্যদের বিবেচনায় আনবেন।

তবে সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বর্তমানে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। অতীতে সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি দক্ষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন নেতাকে মহাসচিব করা হলে দল-সরকারের ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকবে—এই প্রশ্নটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শক্তিশালী মুখ হিসেবে আলোচনায় আছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে তার দক্ষতা রয়েছে। সম্প্রতি বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকসহ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। তবে দলের অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করেন, মহাসচিব পদে মাঠপর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে তিনি কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন।

মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানের কারণে আলোচনায় রয়েছেন হাবিব উন নবী খান সোহেল। ছাত্রদল থেকে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন পরিচালনায় যুক্ত এবং তৃণমূলের সঙ্গে তার যোগাযোগ দৃঢ়। বিএনপি যদি সংগঠনকে নিচ থেকে পুনর্গঠন করার পথে হাঁটে, তাহলে তার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বক্তব্যে পারদর্শিতার কারণে ভিন্নধর্মী আলোচনায় আছেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তিনি মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। মিডিয়ায় তার উপস্থিতি ও বিশ্লেষণী সক্ষমতা তাকে একটি গ্রহণযোগ্য মুখে পরিণত করেছে। তবে সরাসরি সাংগঠনিক দায়িত্বে তার ভূমিকা সীমিত হওয়ায় তাকে ‘সমঝোতার প্রার্থী’ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

অভিজ্ঞতার বিচারে পিছিয়ে নেই আমান উল্লাহ আমান। বিএনপির পুরোনো প্রজন্মের এই নেতা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দল তরুণ ও অধিক সক্রিয় নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছে। এই কারণে তার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবশেষে আলোচনায় থাকা নাম খায়রুল কবির খোকন। সংগঠক হিসেবে তার পরিচিতি থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব এখনো সীমিত। তবে দলের অভ্যন্তরে পরিবর্তনের হাওয়া জোরালো হলে তিনি ‘চমক’ হিসেবেও সামনে আসতে পারেন—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউই।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলকে শক্তিশালী রাখা। তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন, অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন এবং বিরোধী রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা—এই তিনটি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ কৌশল। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকবেন নতুন মহাসচিব।

সব আলোচনা-সমালোচনা, হিসাব-নিকাশের পরও একটি বিষয় পরিষ্কার—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর। কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচন হোক বা সরাসরি মনোনয়ন, যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, তার সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বিএনপির আগামী দিনের সাংগঠনিক রূপরেখা।

রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই এখন একটাই অপেক্ষা—দশ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই কাউন্সিল কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা থাকবে, নাকি সেখান থেকেই আসবে বিএনপির নতুন যুগের সূচনা এবং নতুন মহাসচিবের ঘোষণা।

সূত্র মতে, দীর্ঘ ১০ বছর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপির কাউন্সিল। এরপর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের শিকার দলটির পক্ষে আর সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর দলীয় ফোরামে বিএনপির কাউন্সিলের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। তৃণমূল পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ করে চলতি বছরই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। এ বিষয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বিএনপি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কারণে অবসর নিতে চেয়েছেন এবং চলতি বছরেই কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। রাজনীতি অবশ্যই পরিবর্তনশীল; তাতে পদ-পদবির পরিবর্তন আসবে—এটা স্বাভাবিক। জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, রাজনীতি থেকে এখন অবসর নিতে চাই। আমি খুবই ক্লান্ত। আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে, তাই থাকছি। কাউন্সিলের পর অবসর নিতে চাই। আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।