রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনটি যেন সময়ের ভাঁজে আটকে থাকা এক নীরব সাক্ষী। এক সময় যেখানে দিনভর চিকিৎসা পরিকল্পনা, জরুরি সভা আর কর্মচাঞ্চল্যে মুখর ছিল, আজ সেখানে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত নীরবতা, যা অনেকের কাছেই ভূতুড়ে আবহ তৈরি করে। গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ের পর যেন একেবারেই প্রাণ হারিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনটি। এক সময় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সরব এই প্রাঙ্গণ এখন নীরব আর সেই নীরবতাকে আরও ভারী করে তুলেছে আঙিনাজুড়ে পড়ে থাকা আগুনে পোড়া গাড়ির স্তূপ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার দুই মাস পার হলেও এই ভবনের উন্নয়নে বা অন্য কোনো কাজে লাগাতে নেই কোনো তৎপরতা। নেই কোনো অপারেশন প্ল্যানও। এক টাকাও বরাদ্দ পান না জানিয়ে এখানে দায়িত্বরত যে সামান্য কয়জন কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের নিজেদেরই ঝাড় দিতে হয় অফিস রুম। চা-নাস্তা থেকে শুরু করে যেকোনো আপ্যায়ন করতে হয় নিজেদের টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাকে কাজে লাগানোর জন্য সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য পরিষেবাবিষয়ক সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কার্যালয়। ১৯৫৮ সালে এর কার্যালয় পরিদপ্তর হিসেবে গঠিত হয়। ১৯৮০ সালে এটিকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৩ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত স্থাপনাটিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুর্বৃত্তরা ভবনের আঙিনায় অবস্থিত ২৩টি গাড়িতে আগুন দেয়। এ ছাড়া ভাঙচুর করা হয় আরও ২৮টি গাড়ি। এর মধ্যে ছিল তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ব্যবহৃত গাড়িও। ওই সময় মহাখালী কাঁচাবাজারের পাশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবন, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) ভবন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ভবন, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (আইপিএইচ), জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচির কার্যালয়েও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। তৎকালীন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী এক নিরাপত্তা কর্মী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ওইদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর কিছু কর্মচারী বন্ধের দিনও দায়িত্বরত ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের সার্ভার থাকার কারণে ২৪ ঘণ্টা কোনো না কোনো কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশের সঙ্গে হঠাৎ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে কয়েকশ আন্দোলনকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গেটের কাছে ছুটে আসে। এখানে আওয়ামী লীগের কর্মী আছে বলে তারা চিৎকার করতে থাকে। গেট বন্ধ থাকলেও সবাই মিলে ধাক্কা দিয়ে গেট ভেঙে ফেলে। তিনি আরও জানান, গেট ভেঙে প্রবেশ করে একাধারে গাড়ি ভাঙচুর শুরু করে। একপর্যায়ে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গান পাউডার দিয়ে গাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে ২৩টি গাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেখানে অবস্থিত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মী সেদিন জ¦লন্ত গাড়িগুলো থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিলে বাকি গাড়িগুলো আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায়। তার মতে, ৪-৫ মিনিটের মধ্যে গাড়িগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সরে পড়ে দুর্বৃত্তরা। ওই হামলার ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও তারা এ-সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন জমা দেননি।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির ভাঙাচোরা দেয়াল, ধুলো জমা করিডোর, খোলা দরজা-জানালা আর অন্ধকার সিঁড়িঘরÑ সব মিলিয়ে এটি যেন একটি পরিত্যক্ত স্থাপনার ক্লাসিক উদাহরণ। দিনের আলোতেও ভেতরে ঢুকলে মনে হতে পারে কেউ যেন আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। বাতাসের শব্দ, পুরোনো কাগজের গন্ধ আর মাঝে মাঝে জানালার কাঁপুনি- সব মিলিয়ে জায়গাটি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আঙিনাজুড়ে পোড়ানো গাড়ির স্তূপ গায়ে শিহরণ ধরিয়ে দেবে যে কারো।
যদিও বাস্তবতা হলো- এটি কোনো ভূতুড়ে স্থাপনা নয় বরং অব্যবস্থাপনা, সংস্কারের অভাব এবং প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের একটি প্রতিচ্ছবি। নতুন ভবন ও আধুনিক অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পর পুরোনো ভবনটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়েছে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি আজ এই অবস্থায়। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর স্বাস্থ্য খাতের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়নি। এমনকি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার বিএনপিও ক্ষমতায় আসার দুই মাস পার করলেও এই খাতটি নিয়েই যেন সর্বোচ্চ অবহেলা। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে এক লাখ, দুই লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এমনকি গতকাল সোমবারও যশোরের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এদিন দুপুরে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণকাজের উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুস্থ ও সবল জাতি উপহার দিতে সরকার মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। আমরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমিয়ে আনা। এ জন্য সারা দেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বেন। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারী প্রধানদের খাদ্যের গুণাগুণ ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সচেতন করবেন। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপ কমবে।
সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে এমন ঘোষণা আসলেও অব্যবহৃতভাবে পড়ে থাকা স্বাস্থ্য খাতের ভূতুড়ে স্থাপনাগুলো নিয়ে নেই কোনো পরিকল্পনা। সরেজমিনে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশমুখেই পড়ে রয়েছে কালো হয়ে যাওয়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষ। কোনোটার ছাদ দেবে গেছে, কোনোটার কাচ গলে বিকৃত হয়ে আছে। পোড়া ধাতব কাঠামোর গন্ধ যেন এখনো বাতাসে ভাসে। এই দৃশ্য শুধু ধ্বংসের নয়, এটি সহিংসতার এক জীবন্ত চিহ্ন, যা সময়ের সাথে মুছে যায়নি। ভবনের ভেতরেও একই চিত্র। ভাঙা জানালা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আসবাব, পোড়া দেয়ালের দাগÑ সব মিলিয়ে মনে হয় হঠাৎ করে থেমে গেছে একটি সময়। কর্মচাঞ্চল্যের জায়গায় এখন ভয়াল স্থবিরতা। দিনের আলোতেও ভবনের করিডোরে ঢুকলে অস্বস্তি কাজ করে; আর সন্ধ্যা নামলে জায়গাটি আরও বেশি অচেনা, আরও বেশি নিঃসঙ্গ।
এখনো এই ভবনে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর কার্যক্রম চলমান। এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মো. বদরুল আলম। ৫ ফিট বাই ৫ ফিটের একটি রুমে ফাইলের স্তূপের মাঝখানে একটি চেয়ারে বসে দৈনন্দিন কাজ করা এই কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কোনো অপারেশন প্ল্যান না থাকায় কার্যত আমাদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের রুম ঝাড়– দেই। কোনো গেস্ট আসলে পকেটের টাকায় নাস্তা করাই। নিজেদের যদি একটু কাজের চাপে চা পান করতে হয় সেটাও নিজেদের পকেট থেকেই করতে হয়। আমাদের নতুন ভবনে শিফট করার কথা। কিন্তু কবে নাগাদ করা হবে জানা নেই।
তাদের ঠিক কবে নাগাদ নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হবে এবং স্বাস্থ্যের এই পুরাতন ভবনকে রিকন্ডিশনিং করা হবে কি নাÑ জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আপনারা জানেন গত দুই বছর দেশে একটা রাজনৈতিক অস্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। মূলত সব ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ই স্থবির ছিল। যার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি সাম্প্রতিক হামের ঊর্ধ্বমুখি সংক্রমণে। কারণ বিগত বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিও বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র কিছুদিন হলো। খুব শিগগির পুরাতন স্বাস্থ্য ভবন নিয়ে একটি সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আমরা আশা করছি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চিত্র কেবল একটি ‘ভূতুড়ে’ অনুভূতির গল্প নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখানে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়, হামলার পর দ্রুত পুনর্বাসন বা সংস্কার কেন শুরু হয়নি, পোড়া যানবাহনগুলো এখনো সরানো হয়নি কেন, ভবনটি কি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য, নাকি পরিত্যক্ত হিসেবেই পড়ে থাকবে? এই পুরোনো ভবন আজ একটি নীরব সাক্ষী গণঅভ্যুত্থানের তীব্রতা, সহিংসতার ক্ষত এবং পুনর্গঠনের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। সরকার পরিবর্তনের পর প্রথম ১০০ দিন সাধারণত নীতিনির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ের মধ্যে খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বাজেট পুনর্বিন্যাস এবং বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করা জরুরি। স্বাস্থ্য খাতে সেই গতি এখনো দৃশ্যমান না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে জনসেবায়। যেমন আমরা দেখছি, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি এখনো অকেজো হিসেবে পড়ে রয়েছে। এত বড় একটি স্থাপনা অথচ জনসেবায় কাজে লাগছে না। সম্প্রতি খবরে দেখলাম এর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিনদুপুরে চুরি হয়ে যাচ্ছে ট্রাকে করে। এমনটি যদি হয় আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র তাহলে লাখ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন