মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় এবার মৌসুম শুরুর আগেই দেশজুড়ে ব্যাপক ও আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গুর টিকা এখনো বিশ্বজুড়ে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় এই মুহূর্তে তা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৮০ শতাংশ ব্যয় বহন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ডেঙ্গু নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। বৈঠকে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং উপদেষ্টা ড. জিয়া হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, অনেক পরিত্যক্ত বাথরুমের কমোড এবং গ্যারেজে পানি জমে থাকে, যা মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় ‘নোভালিয়ুরন’ নামক বিশেষ ট্যাবলেট ও লার্ভিসাইড স্প্রে করা হবে। স্থল ও জল উভয় পথেই সমানে স্প্রে কার্যক্রম চালানো হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাড়ির ছাদ, ক্যানেল, মজা পুকুর ও গ্যারেজ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন বাড়িগুলোতে মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) মাধ্যমে তল্লাশি চালানো হবে এবং অবহেলা পাওয়া গেলে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে।
সোসাইটি অব প্রাইভেট মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আগামী শনিবার থেকে ঢাকায় চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হবে, যা পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে ৬৪টি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ইউনিসেফ এবং সরকারের যৌথ অর্থায়নে এই কার্যক্রম চলবে। এ ছাড়া, চিকিৎসকদের সঠিক গাইডলাইনের জন্য নিজস্ব খরচে ১ লাখ প্রটোকল বুক (চিকিৎসা নির্দেশিকা) প্রকাশ করেছে সোসাইটি অব মেডিসিন, যা দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিতরণ করা হবে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মোট সিটের ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিটে রোগীদের কোনো ডাক্তার বা বেড চার্জ দিতে হবে না (শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে)। এ ছাড়া, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সব ডেঙ্গু রোগীর জন্য ল্যাব ইনভেস্টিগেশনে (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) ৮০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো কিছু দেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হলেও এটি এখনো বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন স্বীকৃতি পায়নি। তাই আমরা এখনই ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগ করব না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, আমরা এলডিসি কান্ট্রি হিসেবে হঠাৎ করে এই ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করতে পারি না। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সব দায় আমাদের ওপর আসবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে কথা বলে যদি এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে হয়, তবেই ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে। আপাতত ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে না। টেলিভিশনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্পন্সর করা বিভিন্ন প্রোগ্রামে অন্তত ৩০ সেকেন্ড ডেঙ্গু সচেতনতামূলক স্লোগান (যেমনÑ পানি সরানো, চারপাশ পরিষ্কার রাখা) প্রচার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
শুধু তাই নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক দীর্ঘদিন ধরে ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা করছেন বলে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে অবিলম্বে ওই গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন। তার গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং পরামর্শ বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, শূন্য ভা-ার থেকে যেভাবে অতীতে নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করা হয়েছে, ঠিক তেমনি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবারও ডেঙ্গুর হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। সকাল থেকে প্রথমে সিটি করপোরেশন, পরে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন এবং চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করে মন্ত্রণালয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন