ঢাকা রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

ফাইলবন্দি অর্ধলক্ষ ওয়ারেন্ট

পারভেজ খান
প্রকাশিত: জুন ২১, ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

রাজধানীর ৫০টি থানায় আদালত থেকে জারি হওয়া অর্ধলক্ষাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট তামিলের অপেক্ষায় ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। পুলিশ আর আইনের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘ঝুলে থাকা’। বিভিন্ন সময়ে আসামিদের বিরুদ্ধে এসব পরোয়ানা জারি করে আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য থানায় পাঠানো হলেও অবহেলাসহ নানান কারণে সেগুলো বছরের পর বছর কার্যকর হচ্ছে না। ঝুলে থাকা এসব পরোয়ানার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জিআর বা থানায় দায়ের এবং বাকিগুলো সিআর বা আদালতে দায়ের করা মামলা আর সাজাপ্রাপ্তদের ওয়ারেন্ট। ডিএমপির ক্রাইম ডাটা ও পুলিশ এবং আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের পরিসংখ্যান সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে। 

বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায়সংক্রান্ত অর্থঋণ আদালতের হাজার হাজার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্থবিরতা রয়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা বিভিন্ন বড় দুর্নীতি মামলার পরোয়ানা তামিলের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে থানা থেকে প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল মুনিম গতকাল রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) বছরের পর বছর ধরে তামিল বা কার্যকর না হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের বিচারিক ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বিভিন্ন ফৌজদারি, দেওয়ানি ও অর্থঋণ মামলায় এই বিপুলসংখ্যক পরোয়ানা পুলিশের হাতে পৌঁছালেও তা তামিলের অপেক্ষায় ঝুলে থাকে।

ব্যারিস্টার মুনিম আরও বলেন, এই বিপুলসংখ্যক ওয়ারেন্ট তামিল না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলো হচ্ছে, পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা এবং গোপন লেনদেন করে পরোয়ানাভুক্তদের সঙ্গে আপস করে চলা। এটাই অন্যতম কারণ। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু কারণ আছে। যেমনÑ পরোয়ানা জারির পর আসামিরা বেশির ভাগ সময় ঠিকানা পরিবর্তন করেন বা আত্মগোপনে চলে যান, যার ফলে পুলিশ তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে না। অনেক মামলায় আসামির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হলেও এজাহারে দেওয়া স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা সঠিক থাকে না, যার কারণে পুলিশ সঠিক ব্যক্তিকে ধরতে ব্যর্থ হয়। মূলত পুলিশের তদন্ত ব্যর্থতার কারণেই এটা হয়ে থাকে। আসামির নাম-ঠিকানা ভুল থাকলে তার নামে চার্জশিটই হতে পারে না। এ ছাড়া থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভিআইপি প্রটোকল এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ওয়ারেন্ট তামিল করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। এটাও একটা কারণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই পরোয়ানা তামিল না হওয়ার কারণে মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিরাও জামিনে বেরিয়ে পলাতক হন। ফলে পরোয়ানা তামিলের সংখ্যা ক্রমশ জমা হয়ে আরও বাড়তে থাকে।

পুলিশ ও আদালত সূত্রমতে, ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে মিরপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলে রয়েছে। এর বাইরে মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, উত্তরা ও গুলশান এলাকার থানাগুলোতেও বিপুল পরিমাণ সিআর (বিশেষ করে চেক ডিজঅনার ও অর্থঋণ) মামলার পরোয়ানা অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় ওয়ারেন্ট তামিল ও গ্রেপ্তারে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওয়ারেন্ট ট্র্যাক ও মনিটরিং করতে প্রযুক্তির ব্যবহার (যেমনÑ ‘ওয়ারেন্ট অ্যাপস’ তৈরি) এবং ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগরে পরোয়ানা ঝুলে থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পুলিশের একজন সাবেক আইজিপি বলেন, ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা বাদে বিশাল একটি অংশ ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন। অপরাধ করার পর তারা দ্রুত বাসা পরিবর্তন করে ফেলায় থানা-পুলিশ তাদের শনাক্ত করতে পারে না। আদালতে সিআর মামলা দায়েরের সময় আসামির দেওয়া ঢাকার বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানা অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বা ভুল প্রমাণিত হয়। আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে আদালত ও থানার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। অনেক সময় আসামি আদালত থেকে জামিন নিলেও সেই ‘রিলিজ অর্ডার’ বা জামিননামা সময়মতো থানায় পৌঁছায় না। ফলে থানার খাতায় সেটি পেন্ডিং থেকে যায়। পাশাপাশি ঢাকার ব্যাবসায়িক ও চাকরি সূত্রে আসা অন্য জেলার আসামিরা মামলা হওয়ার পর নিজ গ্রামে আত্মগোপন করেন। ঢাকার পুলিশকে তখন অন্য জেলার পুলিশের সাহায্য নিতে হয়, যা দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাপেক্ষ।

ডিএমপি সূত্র জানায়, ঝুলে থাকা ওয়ারেন্ট তামিলে মহানগর কমিশনারের পক্ষ থেকে সব সময়ই একটা চাপ থাকে এবং প্রতি মাসের ক্রাইম কনফারেন্সেও এটা আলোচনায় আসে। ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (সিডিএমএস) সার্ভার এবং অপরাধ পর্যালোচনা সভার (মে ২০২৬ মাসের ক্রাইম কনফারেন্স) তথ্যমতে ঝুলে থাকা পরোয়ানার বা ওয়ারেন্টের সংখ্যা ছিল ৪১ হাজারের কিছু বেশি। 

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, থানাগুলোতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) তামিল করা এবং নতুন ওয়ারেন্ট যুক্ত হওয়া একটি সার্বক্ষণিক চলমান প্রক্রিয়া। ওয়ারেন্ট তামিল করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট থানা এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতকদের ধরতে নিয়মিত অভিযান জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বা তামিল না হওয়া পরোয়ানাগুলো দ্রুত কার্যকর করার ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওয়ারেন্ট তামিলসহ অন্যান্য পুলিশি দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি, শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কোনো কার্যকলাপ সহ্য করা হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের।

তিনি আরও বলেন, সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) নিজ নিজ এলাকায় তালিকাভুক্ত পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান জোরদার করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া পরোয়ানা তামিলের গড় হার সন্তোষজনক পর্যায়ে না এলে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

আইনজীবীরা বলেন, কোনো মামলার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে যেমন সাক্ষী দরকার, তেমনি প্রয়োজন আসামির উপস্থিতিও। বাদী ও আসামি উভয়েই ন্যায়বিচার চান। কিন্তু এই বিচারের প্রধান প্রতিবন্ধকতা সাক্ষী কিংবা আসামির অনুপস্থিতি। বছরের পর বছর চলে গেলেও কোনো মামলার পলাতক আসামি যদি গ্রেপ্তার না হন, তাহলে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ঢাকার নি¤œ আদালত ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পলাতক আসামিদের প্রায় ৯২ শতাংশই অধরা। অথচ সেই আসামিদের কারো কারো সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের সঙ্গে পুলিশের দহরম-মহরমের অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট তামিলের বিষয়টি থানা-পুলিশের কাছে গুরুত্ব পায় না।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, পলাতক ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের কারণে হাজার হাজার মামলার বিচারকাজ বছরের পর বছর ধরে থমকে আছে। ফলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগও সীমাহীন। ডিএমপির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার (ওয়ারেন্ট) ৯২ শতাংশ আসামিই গ্রেপ্তার হচ্ছেন না।  প্রতি মাসে যে পরিমাণ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি নতুন পরোয়ানা জমা হয়।

একজন প্রসিকিউশন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ সব ধরনের জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর করা। মূলত ওয়ারেন্ট তামিলে সফলতা ছাড়া অপরাধ ব্যবস্থাপনায় সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। ওয়ারেন্ট নিষ্পত্তি ও কার্যকরের ক্ষেত্রে নির্দেশনায় বলা হয়, থানার ইন্সপেক্টর অপারেশনের এবং জোনাল সহকারী কমিশনারের নেতৃত্বে ওয়ারেন্ট তামিল ত্বরান্বিত করতে একটি টিম আছে বা থাকা দরকার। থানার এসআই ও এএসআইদের মাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে তিন মাস পরপর কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা করা হয় বা হওয়া দরকার। ওয়ারেন্ট তামিলে আশাব্যঞ্জক ফল অর্জনে ব্যর্থ হলে বিষয়টি থানার অফিসার ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বার্ষিক মূল্যায়নে উল্লেখ করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে কতটা হচ্ছে সেটাই বড় কথা।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আবদুল্লাহ আবু রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পরোয়ানা পাওয়া আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের আন্তরিকতা আরও বাড়ানো দরকার। আর যেসব পরোয়ানা তামিল করা যাচ্ছে না, সেসব বিষয়ে পুলিশের উচিত আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া।  এ ক্ষেত্রে পুলিশ যথাযথ দায়িত্ব পালন করলে দ্রুত নিষ্পত্তি ও অপরাধীদের সাজা আরও সহজ হবে।

আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসাইন এই প্রতিবেদককে বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের বিষয়টি থানা-পুলিশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। ওয়ারেন্ট তামিলের জন্য এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করার ব্যাপারে গাফলতি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আসামিদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের সমঝোতা হয়। এ কারণে পরোয়ানা তামিল কম হয়।

তিনি আরও বলেন, ওয়ারেন্ট তামিল না হওয়া বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকে দুর্বল করে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলে এই স্থবিরতা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি বিচার প্রক্রিয়ার গতি, আইনশৃঙ্খলার কার্যকারিতা এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর না হলে আদালতের আদেশের বাস্তব মূল্য কমে যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে ন্যায়বিচারের ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে। ফলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সমন্বিত ডাটাবেস এবং থানা পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ানোর প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।