হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের (রহ.) মাজারে দানের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা করে আত্মসাতের বিষয়টি এখন প্রকাশ্য। এ নিয়ে চারদিকে চলছে তীব্র সমালোচনা। কিন্তু এত সব আমলে নিচ্ছে না খাদেম সিন্ডিকেট। উল্টো তারা প্রকাশ্যে মাজার ও দানের টাকা তাদের ‘ পৈতৃক সম্পত্তি’ দাবি করে দুষছেন প্রশাসনকে। বলছেন, টাকার হিসাব চাইবেন, তারা কে?
সম্প্রতি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা, এর বিপুল অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সমালোচনা, ভক্তদের মধ্যে উত্তেজনা এবং খাদেম ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলা জবাবদিহির বাইরে থাকা মাজারকেন্দ্রিক ‘পারিবারিক হিস্যা’ ও লাখ লাখ টাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মাজারের খাদেম সিন্ডিকেট যখন মরিয়া, ঠিক তখনই মাজারের পবিত্রতা রক্ষা, আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং মাদক ও অনৈতিকতা বন্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ, ডেগ সিলগালা ও দানবাক্স চালুর পর থেকে পুরো সিলেটে এখন বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে প্রশাসনের তালা এবং মানতের টাকা সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত তিনটি বিশাল ডেগ সিলগালা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরাসরি প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন দরগার খাদেমরা। তাদেরই একজন সিলেট মহানগর বিএনপির ১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না গণমাধ্যমের সামনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই সম্পত্তি কোনো সরকার বা দলের নয়, মাজার খাদেমদের ‘পৈতৃক সম্পত্তি’ এবং এতে বাইরের কেউ নাক গলালে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। টাকা নেওয়ার বিষয়ে অকপট স্বীকারোক্তি দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খাদেমরা সব টাকা খাই না, তা ঠিক। তবে আমরা যে টাকা খাই, তা সবাই বণ্টন করে নিই। এখানে মিথ্যা বলার কিছু নেই। খাদেমরা যেভাবে টাকা খায়, সেভাবে এখানে দিন-রাত পরিশ্রম আর কাজও করে। সুতরাং কাকে আমরা হিসাব দিব?’ তিনি দাবি করেন, ‘অনেকে মনে করেন হযরত শাহজালাল (রহ.) মারা গেছেন, কিন্তু ওলি-আউলিয়ারা কখনো মারা যান না এবং তিনি এখনো কবরে জীবিত আছেন।’
তবে অনুসন্ধানে তার এই ‘পৈতৃক সম্পত্তি’ দাবির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বিশাল এক সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দরগার সাবেক এক দায়িত্বশীল, যিনি প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর আগে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন, তার দেওয়া তথ্যমতে, তিনি যখন দায়িত্বে ছিলেন, তখন দৈনিক ৫০ হাজার থেকে শুরু করে এক বা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত মাজার থেকে সংগ্রহ হতো। আর দীর্ঘ দুই দশক পর বর্তমানে প্রতিদিন সাধারণত ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং শুক্রবার বা বিশেষ বিশেষ উৎসবের দিনে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ সংগ্রহ হয়। এই বিশাল অঙ্কের টাকার পুরোটাই মূলত দুটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, যারা ‘সরেকওম’ ও ‘মুফতি’ পরিবার নামে পরিচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রাক্তন প্রবীণ এই খাদেম জানান, ১৯৮১ সালে যেখানে এ দুই গোষ্ঠীর সদস্য পরিবার ছিল ১৯৭টি, বর্তমানে তা বেড়ে ৩০০-এর বেশি পরিবারে দাঁড়িয়েছে। এই ৩০০ পরিবারের মধ্যে মাজারের সমস্ত টাকা-পয়সা ‘বাড়ি’ নামের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে ভাগবাঁটোয়ারা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, সপ্তাহের চার দিন দান থেকে ওঠা সমস্ত টাকা পায় ‘সরেকওম’ গোষ্ঠী এবং বাকি ৩ দিন পায় ‘মুফতি’ পরিবার। শুধু মসজিদের ভেতরের দানবাক্সের টাকা আলাদা করে মসজিদে যায়, বাকি সব টাকা যায় এই ৩০০ পরিবারের পকেটে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ৩০০ পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ কোনো ধরনের বৈধ কাজ, চাকরি বা ব্যবসা না করে যুগ যুগ ধরে কেবল এই ভক্তদের আবেগের ও মানতের দানের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করছেন এবং দামি গাড়ি হাঁকাচ্ছেন।
মাজারের একটি সূত্র জানায়, সরেকওম গোষ্ঠী সংখ্যায় খুব একটা না বাড়লেও মুফতি গোষ্ঠীর পরিবার ও সদস্য সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, যার ফলে টাকার ভাগাভাগি ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। মাজারের টাকা নয়-ছয়ের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার পাঁচ বছরের এমপির সমস্ত বেতন এই দরগায় দান করেছিলেন, কিন্তু সেই বিপুল অর্থও খাদেমদের হাত ধরে গায়েব ও নয়-ছয় হয়ে যায়। এমনকি দেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তিন মেয়ের পর এক ছেলেসন্তান পাওয়ার মানত পূরণ করতে সিলেট এসে দরগায় যে গরু দান করেছিলেন, তা-ও এই ৩০০ পরিবারের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে কেটে খাওয়া হয়েছিল। স্থানীয় মহলের অভিযোগ, মাজারকে কেন্দ্র করে এক অভিনব জালিয়াতি চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে ভক্তদের দেওয়া একেকটি মানতের গরু মাজারের ভেতরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয় এবং ভক্তদের দেওয়া মানতের মোমবাতিগুলো মাজারের পেছনের দরজা দিয়ে আবার বাইরের দোকানে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মানতের ছাগল, খাসি, মুরগিও সুবিধামত সময়ে মাজার থেকে ওই দুই সিন্ডিকেট মেম্বারদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরকম একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যায়, মাজার থেকে খাসি, ছাগল পাশে থাকা এক খাদেমের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছামাত্র তা সুরক্ষিত করা হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে।
সূত্র জানায়, বিনা পরিশ্রমে লাভ করা এই বিপুল পরিমাণ টাকা এবং মাজারের ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবহার করে দরগার আশপাশের এলাকায় বিশাল বিশাল বহুতল আবাসিক হোটেল ও ফোর-স্টার মানের হোটেল বানিয়ে কোটিপতি বনে গেছেন এ দুই গোষ্ঠীর প্রধানেরা। অথচ মাজারের ওপর নির্ভরশীল এ দুই গোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা উচ্চশিক্ষা নেই, হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র উচ্চ শিক্ষিত। এ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নীরব প্রতিযোগিতা এতটাই প্রকট যে, স্থানীয় সিটি করপোরেশনের কমিশনার নির্বাচন নিয়েও তারা একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে থাকেন।
বর্তমানে দরগার মূল মুতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্বে আছেন ‘সরেকওম জঙ্গি’ সামুন মাহমুদ। তিনি আসলে একজন সাধারণ কেরানি। সামুন মাহমুদ বিভিন্ন পর্যায়ে লবিং এবং যেকোনো পরিস্থিতি ভালোভাবে ‘ম্যানেজ’ করতে পারেন বলে খাদেম সিন্ডিকেট তাকে ঢাল হিসেবে সামনে উপস্থাপন করে ফায়দা লুটছে। এই সামুন মাহমুদ ও জিন্নুন নামের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি মূলত মৌলভীবাজারের বাসিন্দা হলেও সিলেটে এসে মাজারের নিয়ন্ত্রণভার তদারকি করছেন।
প্রশাসন সূত্র জানায়, দরগার আয়ের এই অপব্যবহার বন্ধে অতীতে তৎকালীন প্রভাবশালী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং তার কাছে হিসাবও জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মৌলভীবাজারের রাজনীতি থেকে সিলেট শহরের রাজনীতিতে নিজের প্রভাব ধরে রাখার আগ্রহ এবং হিসাব নিয়ে বিতর্কে গেলে ভোট ব্যাংকে বড় আঘাত আসতে পারে, এমন রাজনৈতিক ভীতি থেকে তিনি পরে চুপ হয়ে যান। ফলে সংস্কারকাজ থমকে দাঁড়ায়।
দীর্ঘদিন পর জেলা প্রশাসনের এই সাহসী উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমীকরণ কাজ করছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। মাজারকেন্দ্রিক এই সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী কৌশলী নীরবতা পালন করছে, অন্যদিকে বিএনপির একটি বৃহৎ অংশ পর্দার আড়াল থেকে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। মাজারের এই অঞ্চল (ওয়ার্ড) ঐতিহ্যগতভাবেই জামায়াতের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এবং সিলেট জামায়াত ঐতিহাসিকভাবেই মাজারের এসব শিরক, বিদআত ও মাজারকেন্দ্রিক পরজীবী অর্থনীতির চরম বিরোধী। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা, ডিসি সারওয়ার আলমের এই দ্রুত পদক্ষেপের পেছনে জামায়াত বা প্রশাসনের ওপর মহলের কোনো প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা এজেন্ডা থাকতে পারে।
রাজনৈতিক সূত্র জানায়, সিলেট বিএনপির দুটি ধারা এখন এই ইস্যুতে দুই দিকে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সিলেটের বর্তমান দুই মন্ত্রী বা প্রভাবশালী নেতার অবস্থান এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন হলেও, একজন বিএনপি নেতা খাদেমদের পক্ষে ভূমিকা পালন করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দরগার সাবেক সর্বজন শ্রদ্ধেয় মরহুম ইমাম আকবর আলীও জীবদ্দশায় এই দুর্নীতির বিষয়টি জানতেন, তাই তিনি কোনো ভক্তকে মাজারের বাক্সে টাকা না দিয়ে রসিদ বা ভাউচারের মাধ্যমে সরাসরি দরগার নিজস্ব মাদ্রাসা ও এতিমখানায় দান করার পরামর্শ দিতেন।
দর্শনার্থীরা ভক্তদের দেওয়া প্রতিদিনের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি কিংবা ফলফলাদিও যাতে খাদেমরা গোপনে কেটেকুটে না খেতে পারেন, সে জন্য এগুলো প্রতিদিন মাজার প্রাঙ্গণেই উন্মুক্ত নিলাম করে সেই টাকা সরাসরি মাজারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করার জোরালো দাবি জানান।
মাজারের খাদেম পরিবারের সদস্য মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না প্রশাসনিক সংস্কারের ঘটনাকে বর্তমান সরকার ও বিএনপি পরিবারকে বিতর্কিত করার একটি ‘কুচক্রী মহলের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। বলেন, জেলা প্রশাসককে কেউ ভুল বুঝিয়ে তাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। মাজারের ভক্তরা তা হতে দেবে না।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম গণমাধ্যমকে সাফ জানিয়েছেন, মানুষ চায় তাদের দেওয়া পবিত্র অর্থ যেন স্বচ্ছ ও সৎভাবে ধর্মীয় কাজেই ব্যয় হোক। দানের অর্থের হিসাব ও ব্যবহারে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, মাজারের আয়ের একটি টাকাও সরকার নিজের তহবিলে নেবে না, বরং তা মাজারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হবে। মাজারগুলোকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের সুশৃঙ্খল ও সেবাবান্ধব করতে সেখানে একটি সুধী মেডিকেল সেন্টার, নারীদের জন্য আধুনিক ও পৃথক নামাজের ব্যবস্থা এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করে একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওলি-আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত এই পবিত্র স্থানগুলোতে মাদক সেবন, গাঁজার আসর বা যেকোনো ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকা- কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ডিসি।

