বিশ্বজুড়ে অভিবাসন ও ভিসানীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জনসেবার ওপর চাপের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, কানাডা, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক আশ্রয়লাভ কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বাংলাদেশিদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক কড়াকড়ির পাশাপাশি ভুয়া তথ্য, জাল কাগজপত্র ও ভিসার অপব্যবহারের মতো অনিয়মও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ করছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে বৈধ আবেদনকারীদেরও।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের পথ আরও সংকুচিত : অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং ভিসাব্যবস্থায় কড়াকড়ির পাশাপাশি নতুন অভিবাসন সীমাবদ্ধতা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের অনেক নাগরিকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে অভিবাসনের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পেলেও দিতে হবে ব্যয়ের অংশ : যুক্তরাজ্যও আশ্রয়নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, যারা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন এবং পরে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি চাইবেন, তাদের রাষ্ট্রের ব্যয় করা থাকা-খাওয়ার খরচের অংশ হিসেবে প্রায় দশ হাজার পাউন্ডÑ অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ষোলো লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে।
দেশটির সরকারের ভাষ্য, এটি আয়ভিত্তিক পরিশোধব্যবস্থা হবে এবং যারা পরে আয় করতে সক্ষম হবেন, শুধু তারাই এই অর্থ পরিশোধ করবেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, যুদ্ধ, নির্যাতন বা দুর্ভিক্ষ থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ওপর এটি অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। ফলে নতুন অভিবাসীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
ইউরোপে ফিরছে কঠোর নির্বাসননীতি : ইউরোপীয় দেশগুলোও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হচ্ছে। নতুন নীতিমালায় আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো, ইউরোপের বাইরে প্রত্যাবর্তনকেন্দ্র স্থাপন এবং নির্বাসন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির উত্থান এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকসংখ্যক শরণার্থীর আগমনের পর থেকেই ইউরোপ এই পথে হাঁটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, নতুন নীতির ফলে আটককেন্দ্রের ব্যবহার বাড়বে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার আরও সংকুচিত হবে।
বাংলাদেশ ‘নিরাপদ’ তালিকায়, কমছে সম্ভাবনা : ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার পাশাপাশি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে রোমানিয়া ও ক্রোয়েশিয়া বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যত বন্ধ রেখেছে। জার্মানি অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি আরো কঠোর করেছে।
কানাডা ও জাপানেও বদলে যাচ্ছে নীতি : দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের অন্যতম পছন্দের দেশ কানাডাও এবার প্রথমবারের মতো অভিবাসীর সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জনসেবার ওপর চাপ কমাতে আগামী কয়েক বছরে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা ধাপে ধাপে কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী শ্রমিক গ্রহণেও সীমাবদ্ধতা বাড়ছে।
জাপানও অভিবাসন ও বিদেশি প্রবেশনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। দেশটিতে ভিসার ফি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী বসবাসের আবেদন এবং অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন ফিও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। জাপান সরকারের দাবি, প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যেও সংকুচিত হচ্ছে সুযোগ : শুধু পশ্চিমা দেশ নয়, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন ভিসা সীমিত রেখেছে। কাতার, বাহরাইন ও সৌদি আরবেও আগের তুলনায় ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি রয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, লাওস, মিসর, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রদান কার্যত বন্ধ রেখেছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার ভিসা মিললেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী উত্তেজনা : দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী মনোভাব নতুন করে সহিংস রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠী অবৈধ বিদেশিদের দেশ ছাড়ার আলটিমেটাম দিচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু বিদেশি হামলার শিকার হয়েছেন, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
দেশটির সরকার বিদেশিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানালেও বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশিদের জন্য বাড়ছে ভিসা জটিলতা : অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের অন্যতম কারণ হলো ভুয়া তথ্য, জাল নিয়োগপত্র, জাল ব্যাংক হিসাব, ভিসার শর্ত ভঙ্গ এবং অন্য দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা। এসব কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের আবেদনকারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেনও বলেন, একজনের ভুলের কারণে পুরো দেশের নাগরিকদের ভোগান্তি বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে জাল তথ্য ও প্রতারণা বন্ধ করে দেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অর্থনীতি বনাম রাজনীতি : অভিবাসন সীমিত করার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। যুক্তরাজ্যের মতো দেশে স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণ পরিচর্যা, কৃষি ও বিভিন্ন সেবা খাত এখনো ব্যাপকভাবে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল। অভিবাসী কমে গেলে শ্রমিক সংকট, কর আদায়ে ঘাটতি এবং জনসেবায় চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
একইভাবে কানাডা ও ইউরোপের অনেক দেশেও জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় দক্ষ অভিবাসীদের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামীর পথ : বিশ^ব্যাপী অভিবাসন এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নিয়ন্ত্রিত। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক চাপ এবং জনমতের কারণে একের পর এক দেশ সীমান্ত ও ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বৈধ উপায়ে অভিবাসন নিশ্চিত করা, ভিসা আবেদনে শতভাগ সঠিক তথ্য প্রদান, জালিয়াতি দমন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার না করতে পারলে ভবিষ্যতে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব যখন অভিবাসনের দরজা ক্রমশ সংকুচিত করছে, তখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজের সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন