মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে নীতি সুদহার আগের মতোই ১০ শতাংশ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থবিরতা কাটিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি আনতে শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে। শিল্প, কৃষি ও সিএমএসএমই খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নতুন মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হওয়া উচিত, সেখানে বর্তমানে তা ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার (রেপো) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এ ছাড়া আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এই সুদহার প্রযোজ্য হয়। অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার পর বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ডেপুটি গভর্নর জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই নীতিগত অবস্থানের ফলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইতিবাচক উদ্দীপনা দেখা যাবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতিও ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। মুদ্রানীতি ঘোষণায় বলা হয়েছে, সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থবছরের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুদ্রানীতি করেছে। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই তহবিল শিল্প, কৃষি ও কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শিল্প উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত হবে। মুদ্রানীতিতে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাজারভিত্তিক ও নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং প্রবাসী আয় আরও উৎসাহিত হবে। বাস্তবায়ন, প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি পদ্ধতি চালু, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন চূড়ান্ত করার উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালত আইনে সংশোধন এনে ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনে স্বচ্ছতা ও আন্তঃব্যাংক লেনদেন সহজ করতে ‘বাংলা কিউআর’ নামে অভিন্ন ডিজিটাল পরিশোধব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও মুদ্রানীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নির্বিঘœ ডিজিটাল লেনদেন সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তার ফলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি ফিরবে। তবে জ¦ালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আগামী দিনেও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১৮ মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ছয় মাসের নীতি গত সোমবার জারি করা হয়েছে। নতুন এই নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে থাকা, তবে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। আমরা কিন্তু এখন আর পুনঃ তপশিলীকরণ একেবারেই উৎসাহিত করছি না।’
গভর্নর আরও জানান, আগামী বছরের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটি আইন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেÑ একটি হচ্ছে অর্থঋণ আদালত আইন এবং অন্যটি সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন। সরকারের কাছে প্রস্তাব, এই আদালতের বিচার প্রক্রিয়া যেন সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে শেষ হয়। বর্তমানে অর্থঋণ আদালত বা অন্যান্য আদালতে মামলাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চলে। সেই সুযোগ কমানোর জন্যই এই সুপারিশ বলে মন্তব্য করেন গভর্নর। এই আইন পাস হলে ২০২৭ সালে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পাবে। নতুন আইন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ক্ষতিকর সম্পদ নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নিজেদের আর্থিক বিবরণীতে রাখা যাবে না, বরং তা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য করা হবে। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়মের ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি পালন করা হবে বলে জানান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। গভর্নর আরও বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং সুপারভিশন ডিপার্টমেন্টকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, যেকোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তি সর্বোচ্চ হবে। আগে হয়তো সর্বনি¤œ মাত্রার শাস্তি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন থেকে সর্বোচ্চ শাস্তিই দেওয়া হবে।’
গভর্নর বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য। তবে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে গতি ফেরাতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। এ কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে জোগান দেওয়া হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন