ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যকে ঘিরে পুরো দেশ যেন এক অভূতপূর্ব শোক, আবেগ ও জাতীয় সংহতির আবহে আবদ্ধ হয়েছে। রাজধানী তেহরান থেকে পবিত্র নগর কোম, সেখান থেকে মাশহাদÑ প্রতিটি শহরেই লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করছে, দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে এই বিদায় এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে। যুদ্ধের ক্ষত, প্রিয় নেতাকে হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উদ্বেগের মাঝেও ইরানের সাধারণ মানুষ ঐক্য, ধৈর্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় শুরু হয় রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানের মূলপর্ব। ভোর থেকেই বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মানুষ রাজধানীতে আসতে শুরু করেন। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, তরুণ, ধর্মীয় শিক্ষার্থী, সেনাসদস্যÑ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো পরিণত হয় শোকের জনসমুদ্রে। অনেকেই হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ ফুল, আবার কেউ কোরআন শরিফ নিয়ে শেষবারের মতো প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের এই উপস্থিতি ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার সমাবেশের সঙ্গে তুলনীয়। টানা তিন দিন ধরে তেহরানের বিভিন্ন সড়কে মানুষের ঢল ছিল চোখে পড়ার মতো। শোকযাত্রার প্রতিটি মুহূর্তে মানুষের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল প্রার্থনা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রত্যাশা।
এই বিশাল আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্বেচ্ছাসেবীদের ভূমিকা। হাজার হাজার মানুষের জন্য দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করেছেন অসংখ্য তরুণ-তরুণী ও বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা। অস্থায়ী শিবিরগুলোতে আগত শোকার্থীদের জন্য রান্না হয়েছে গরম খাবার, বিতরণ করা হয়েছে বিশুদ্ধ পানি, চা, বিস্কুট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। সকাল, দুপুর ও রাতÑ তিন বেলাই হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সেবামূলক কার্যক্রমের অধিকাংশ ব্যয় বহন করেছেন সাধারণ মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে খাবার বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা। যুদ্ধের কারণে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অনেক স্বেচ্ছাসেবীও নিজেদের শোক ভুলে মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তেহরানের বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে গভীর রাত পর্যন্ত বসানো হয়েছিল চায়ের স্টল। সেখানে আগত মানুষকে বিনা মূল্যে চা ও বিস্কুট পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে এই কার্যক্রম পরিচালনা করে।
শোকানুষ্ঠান চলাকালে চিকিৎসাসেবাও ছিল অব্যাহত। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৩৪ হাজারের বেশি মানুষকে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে। প্রচ- ভিড় ও দীর্ঘ সময় অবস্থানের কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
তেহরানে রাষ্ট্রীয় বিদায় শেষে হেলিকপ্টারে করে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহ নেওয়া হয় পবিত্র নগরী কোমে। সেখানে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক দফা শোকযাত্রা। জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজের মাধ্যমে দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ শোভাযাত্রা মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) বুলেভার্ড অতিক্রম করে হজরত ফাতিমা মাসুমাহ (সা.)-এর পবিত্র মাজারের দিকে অগ্রসর হয়। আকাশ থেকে ধারণ করা বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, কোম নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে উপচেপড়া মানুষ। শুধু ইরান নয়, তুরস্ক, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
শোকযাত্রার একটি বিশেষ দৃশ্য মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। একটি বিশেষ বাহনে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মরদেহের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহও বহন করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, নিহতদের মধ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির মাত্র চৌদ্দ মাস বয়সি নাতনির ছোট কফিনও ছিল। পথজুড়ে মানুষ ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া বহু মানুষের বক্তব্যে উঠে আসে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের কথা। অনেকের মতে, দেশের কঠিন সময়ে জনগণের এই উপস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতির প্রতীক। কেউ কেউ বলেন, যুদ্ধ ও সংকটের মধ্যেও জনগণ দেশের নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা ও সমর্থন প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বও এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই, কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শোকযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়ের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত কঠোর। সাম্প্রতিক যুদ্ধ এবং চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠানজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল। বিশেষ করে নতুন নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত রাখা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কোমে শোকানুষ্ঠান শেষে মরদেহ ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। সেখানে শোকযাত্রা ও জানাজায় বিভিন্ন শিয়া ধর্মীয় নেতা এবং মিত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এরপর মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে জন্মস্থান মাশহাদে নিয়ে যাওয়া হবে।
আগামী বৃহস্পতিবার মাশহাদে আরেকটি শোভাযাত্রার পর হজরত ইমাম রেজার পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে দাফন করা হবে। দীর্ঘ কয়েকদিনের এই রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল একটি বিদায় অনুষ্ঠান নয়, বরং ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

