মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ বন্ধ ঘোষণা করার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ১৪০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিসহ কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতমুখী ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন হামলার দাবি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে সরু হয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ।
সংঘাতের সূত্রপাত হয় চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার পর। গত রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, অনুমোদনহীন নৌপথ ব্যবহার করায় একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও সতর্কতামূলক গুলিতে থামিয়ে দেওয়া হয়। আইআরজিসি দাবি করে, বারবার নির্দেশ অমান্য করায় জাহাজটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং এরপরই হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে, এই সিদ্ধান্তের জেরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি জাহাজে আইআরজিসির হামলার পর তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, যোগাযোগ নেটওয়ার্কসহ ১৪০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এক নাবিক নিখোঁজ হন। পরে ওমান সরকার জানায়, জাহাজের ২৩ নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাহাজে থাকা ১১ ভারতীয়ের মধ্যে ১০ জনকে উদ্ধার করা গেলেও একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন তার মূল্য দিতে হবে।’ অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন হামলায় কেরমান ও জাস্ক এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গত চার দিনে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন বলে ইরানি সূত্রের দাবি।
পাল্টা হামলায় জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। জর্ডান, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান নিজ নিজ ভূখ-ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। কাতারে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষে অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, সৌদি আরব, কাতার ও লেবানন এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে একে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম, প্রতিশ্রুতি রাখুন, না হলে মূল্য দিতে হবে।’ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে তিনি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন। অপরদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি, যিনি সম্প্রতি নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি হয়েছেন, টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভাষণে বলেন, ‘প্রতিশোধ জাতির ইচ্ছা।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এরই মধ্যে আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া বহু মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বানসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করেন। ট্রাম্প পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমন কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করা হবে।
বিশে^র জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এই সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশে^র প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশি^ক জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ঝুঁকির মাত্রা ‘চরম’ বলে ঘোষণা করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন