কথায় আছে, শরীর ঠিক তো দুনিয়া ঠিক। কিন্তু বর্তমান বাজারে ভেজাল পণ্যের ভিড়ে আমরা কি আসলেই ঠিক আছি? চকচকে দেখে বাজার থেকে যা কিনছেন তা কতটা নিরাপদ? এ নিয়ে মনে একটা খটকা থেকেই যায়। ফরমালিন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক আর রাসায়নিক প্রিজারভেটিভের দাপটে এখন সুস্থ থাকাটাই যেন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি মানুষ শুধু অনিরাপদ খাবার খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, পশুখাদ্য ও কৃষিতে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে এমন এক অন্ধকার সময়ে অর্গানিক ফুড বা জৈব খাদ্য আমাদের সামনে আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। আধুনিক মানুষ এখন জীবনযাপনের মূলমন্ত্র বদলে ফেলছে এবং সুস্থ থাকতে প্রকৃতির কাছেই আশ্রয় খুঁজছে। চিন্তাধারা পরিবর্তন করে চারপাশের অনিরাপদ খাদ্যের ভিড়ে নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মানুষ এখন প্রবলভাবে অর্গানিক ফুড বা জৈব খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু অর্গানিক ফুড আসলে কী তা নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। সহজ কথায় বলতে গেলে, যে খাবার উৎপাদনে কোনো ধরনের কৃত্রিম সার, বিষাক্ত কীটনাশক বা জেনেটিক্যালি মোডিফাইড উপাদান ব্যবহার করা হয় না, সেটিই অর্গানিক। এটি চাষ করা হয় প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে। মাটির উর্বরতা বাড়াতে ব্যবহার করা হয় জৈব সার আর পোকা তাড়াতে ব্যবহার করা হয় ভেষজ পদ্ধতি। ঢাকার খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্গানিক খাবারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলোÑ এতে কোনো বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ থাকে না। রাসায়নিকযুক্ত খাবার আমাদের কিডনি ও লিভারের যে পরিমাণ ক্ষতি করে, অর্গানিক খাবার তা থেকে আমাদের রক্ষা করে। এমনকি অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ ফসলের তুলনায় অর্গানিক ফসলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
আজকালকার ব্যস্তজীবনে অনেকেই খুব সহজেই প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু এসব রিফাইন্ড খাবার আমাদের অজান্তেই শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে। স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ আর হৃদরোগ এখন ঘরের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ এখন আবার পুরোনো দিনের খাবারে ফিরে যাচ্ছে। আর বাজারে এই পরিবর্তনের পালে হাওয়া দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা। অনলাইন বা অফলাইন এখন নানা ফুডের সন্ধান মিলছে, যারা ঘরোয়া এবং প্রাকৃতিক খাবার নিয়ে কাজ করছে। তারা সরাসরি কৃষকের মাঠ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে কোনো রাসায়নিক ছাড়াই তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের পণ্যের তালিকায় থাকা যবের আটা, ছোলার ছাতু কিংবা সুপারফুড সজিনার মতো অনেক জৈব খাদ্য। এ বিষয়ে এক অর্গানিক উদ্যোক্তা মাসুদ করিম বলেন, ‘এই যে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে, এটা কেবল নিজের স্বাস্থ্যে নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও এক বড় বিনিয়োগ। কারণ ছোটবেলা থেকেই যদি বিষমুক্ত খাবার নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। অর্গানিক খাবার নিয়মিত গ্রহণ করলে হজমশক্তি বাড়ে, শরীরে উদ্দীপনা তৈরি হয় এবং মানসিক প্রশান্তি আসে। এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। তাই বলা যায় এই খাতটি আমাদের পরিবেশের জন্যও আশীর্বাদস্বরূপ। রাসায়নিক সার আর কীটনাশক ব্যবহারের ফলে আমাদের কৃষি জমি ও পানির যে ক্ষতি হচ্ছে, অর্গানিক চাষাবাদ তা থেকে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। মাটি তার হারানো উর্বরতা ফিরে পায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। তাই অর্গানিক খাবার বেছে নেওয়ার অর্থ হলো আপনি একই সঙ্গে নিজেকে এবং আপনার চারপাশের প্রকৃতিকেও সুস্থ রাখছেন। যদিও সাধারণ খাবারের তুলনায় অর্গানিক খাবারের দাম কিছুটা বেশি মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ আর কষ্টের কথা ভাবলে এই সামান্য বাড়তি দামকে আশীর্বাদ হিসেবেই ধরা উচিত।’
কোথায় পাবেন অর্গানিক ফুড
ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরা ও ধানমন্ডির মতো এলাকায় এখন অর্গানিক ফুডের অনেক বিশেষায়িত দোকান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে স্বপ্ন, আগোরা বা ইউনিমার্টের মতো বড় সুপারশপগুলোতে এখন আলাদাভাবে অর্গানিক বা ন্যাচারাল ফুড সেকশন থাকে। সেখানে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিল ও মান যাচাই করে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় পণ্যটি কিনতে পারেন। সরকারিভাবেও এখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় অর্গানিক মেলার আয়োজন করে, যেখান থেকে সরাসরি খামারিদের উৎপাদিত ফসল ও দুগ্ধজাত পণ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। এ ছাড়া অনলাইন কেনাকাটায় ‘আমাদের’ খাস ফুড বা মীনাবাজার অনলাইনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো থেকেও নির্ভেজাল অর্গানিক ফুড সংগ্রহ করা যায়।

