× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:০৮ এএম

গবেষণা প্রতিবেদন

উপকূলীয় ১৯ জেলায় ধান চাষে মহাবিপর্যয়

হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ১২:০৮ এএম

উপকূলীয় ১৯ জেলায় ধান চাষে মহাবিপর্যয়

বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি উপকূলীয়সহ ১৯ জেলায় ধান উৎপাদন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এই অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এশিয়ান জার্নাল অব রিসার্চ ইন ক্রপ সায়েন্স’-এর ১১ নম্বর ভলিউমে এমন তথ্য প্রকাশ হয়েছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলো হলোÑখুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরগুনা। চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী। এগুলোর মধ্যে ১৬টি উপকূলীয় জেলা রয়েছে।

গবেষক দলের মতে, এখনই যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ধান উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

গবেষণার সারসংক্ষেপ : ‘বাংলাদেশে প্রধান দানাদার শস্য উৎপাদনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব : একটি প্যানেল ডাটা বিশ্লেষণ’ শিরোনামে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএইউ) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ‘অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিকস’ বিভাগের একদল গবেষক ও শিক্ষার্থী এই গবেষণা পরিচালনা করেন।

গবেষণার মূল পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে ছিলেন ওই বিভাগের চার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তারা হলেনÑপ্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ সায়েম, মো. আখতারুল আলম, মো. শফিকুল ইসলাম ও মো. ফখরুল হাসান। এ ছাড়া শিক্ষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থেকে তথ্য সংগ্রহ ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে যুক্ত ছিলেন বিভাগের চারজন শিক্ষার্থী। তারা হলেনÑসাদিয়া নুসরাত নওশিন, রোকসানা আক্তার, আনিকা তাবাসসুম মোমো ও বিজয় চন্দ্র সরকার।

গবেষণার অন্যতম প্রধান ফলাফল হলো, ধানের ওপর তাপমাত্রার দ্বিমুখী প্রভাব। গবেষক দলের সংশ্লিষ্ট লেখক শেখ মোহাম্মদ সায়েম ও মো. শফিকুল ইসলাম জানান, আউশ ও আমন ধান গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য মাঝারি ধরনের তাপমাত্রা সহায়ক ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিপদ ঘটে ধান পাকার সময় এলে। গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ : বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধান যখন শীষ থেকে চাল হওয়ার পর্যায়ে থাকে, তখন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে ধানের দানা অপুষ্ট থেকে যায়। গবেষকরা একে ‘হিট স্ট্রেস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে তাপমাত্রার প্রভাব সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। তীব্র গরমের কারণে বোরো ধানের ফলন হেক্টরে কয়েক মণ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে গবেষণায় গাণিতিক উপাত্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

বৃষ্টিপাত ও উৎপাদন বৈচিত্র্যের সমীকরণ : উপকূলীয় ১৯টি জেলায় ধানের উৎপাদনে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ করেছেন গবেষকরা। প্যানেল ডাটা অনুযায়ী, আমন ধানের গড় ফলন চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি (বার্ষিক গড় ৪.৬২ লাখ টন), যেখানে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে শরীয়তপুর জেলা। বোরো ধানের উৎপাদনে যশোর জেলা অপ্রতিদ্বন্দ্বী (গড় ফলন ৬.৩৬ লাখ টন) এবং আউশ ধানের ক্ষেত্রে ভোলা জেলা শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত তিন মৌসুমের ধানের জন্যই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বা অসময়ে অতিবৃষ্টি আমন চাষিদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ও সরাসরি উৎপাদন বাড়লেও জলবায়ুর অভিঘাতে জমির গুণমান বা উর্বরতা দিন দিন নষ্ট হচ্ছে।

লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা উপকূলের নীরব ঘাতক : গবেষণাপত্রে উপকূলীয় ১৯টি জেলার একটি মানচিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৫৩ শতাংশ আবাদি জমি কোনো না কোনো পর্যায়ে লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে জলোচ্ছ্বাসের লবণাক্ত পানি যখন ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ে, তখন সেই জমি বছরের পর বছর ধান চাষের অনুপযোগী থেকে যায়।

এ বিষয়ে গবেষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লবণাক্ততার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা উপকূলের কৃষকদের জন্য এক নীরব মহামারি। অতিবৃষ্টি বা দুর্যোগের পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে ধানের শিকড়ে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং ফলন নাটকীয়ভাবে কমে যায়।’ এই পরিস্থিতির কারণে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ঘের বা অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাঠ পর্যায়ের চিত্র ও কৃষকদের সীমাবদ্ধতা : গবেষণাটি পরিসংখ্যাননির্ভর হলেও এতে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের বাস্তব সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। উপকূলের অনেক কৃষক এখনো জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বুঝতে না পেরে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। জলোচ্ছ্বাসের পর জমিতে জমে থাকা লবণ দূর করার মতো উন্নত প্রযুক্তি বা কারিগরি জ্ঞান অনেক প্রান্তিক কৃষকের নাগালের বাইরে। ফলে তারা বাধ্য হয়েই চাষাবাদ ছেড়ে পেশা পরিবর্তন করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি শ্রমিকের সংকট তৈরি করছে।

বিশেষ করে বোরো চাষের সময় মাঠ পর্যায়ে পানির পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা এবং ধান পাকার সময় আকস্মিক উচ্চ তাপমাত্রা কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষকরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে মানিয়ে নিতে পারছেন না, যার জন্য বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।

গবেষকদের সুপারিশ ও প্রস্তাব : গবেষকরা শুধু সংকট ও সমস্যাই চিহ্নিত করেননি, এই সংকট থেকে উত্তরণে তারা নীতিনির্ধারকদের কাছে কিছু সুপারিশ পেশ করেছেন। গবেষকরা বলেন, উপকূলীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত লবণাক্ততা-সহনশীল এবং তাপ-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

গবেষক দলের সুপারিশগুলো হলোÑলবণাক্ততা-সহনশীল বীজ (যেমন ব্রি-ধান ৪৭)-এর ব্যাপক প্রসার ঘটানো, বোরো মৌসুমে ‘হিট স্ট্রেস’ মোকাবিলায় নতুন জাতের গবেষণা বাড়ানো, উপকূলীয় বাঁধ মেরামত ও পর্যাপ্ত স্লুইস গেট নির্মাণের মাধ্যমে লোনা পানির প্রবেশ ঠেকানো, জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য বাধ্যতামূলক ‘কৃষি বীমা’ চালু করা, বোরো মৌসুমে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উন্নত সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা, লোনা মাটির উপযোগী বিশেষ সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া, মাঠ পর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের জলবায়ু পরিবর্তনের সঠিক তথ্য ও পূর্বাভাস সরবরাহ, ধানের পাশাপাশি উপকূলের উপযোগী বিকল্প বা বহুমুখী ফসলের প্রশিক্ষণ, কৃষকদের মোবাইলে সঠিক সময়ে ঝড়ের বা তাপমাত্রার সতর্কতা প্রদান এবং উপকূলীয় ১৯ জেলার কৃষকদের জন্য বিশেষ সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্যাকেজের ব্যবস্থা করা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!